আল্ মামুন | যুক্তরাষ্ট্র
বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা ও স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) অর্জন করল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’। দেশের সাধারণ মানুষের ‘শেষ ভরসাস্থল’ হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটিকে চিকিৎসা সেবায় অসামান্য ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে।
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিনিধিদের হাতে এই মর্যাদাপূর্ণ পদক তুলে দেন। পুরস্কার হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি আঠারো ক্যারেট মানের পঞ্চাশ গ্রাম ওজনের স্বর্ণপদক, একটি সম্মাননা সনদ ও একটি সম্মানীর চেক প্রদান করা হয়।
১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি কেবল দক্ষ চিকিৎসক তৈরির সূতিকাগারই নয়, বরং ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি জাতীয় সংকটে পালন করেছে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা। শয্যা সংখ্যার দিক থেকে এটি বর্তমানে বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম হাসপাতাল। তবে বাস্তবে হাসপাতালটির বারান্দা ও মেঝেতে থাকা রোগীদের হিসাব করলে এটি বিশ্বের শীর্ষ ১০টি হাসপাতালের একটি হিসেবে গণ্য হওয়ার দাবি রাখে।
সাবেক শিক্ষার্থী এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন রেজিস্ট্রার মাহবুব মোতানাব্বি (কে-৩৫ ব্যাচ) তাঁর ফেইসবুক পেইজে এই অর্জনের মাহাত্ম্য ও হাসপাতালের ভেতরের চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর স্মৃতিচারণ থেকে উঠে আসা মূল বিষয়গুলোর মধ্যে উঠে এসেছে।
• মেধার মিলনমেলা: তিনি সত্তরের দশকের স্মৃতি হাতড়ে লিখেছেন, তৎকালীন সময়ে দেশের বাছাই করা মেধাবীদের ভিড়ে মুখরিত ছিল এই ক্যাম্পাস। স্ট্যান্ড করা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে ক্লাসরুমগুলো থাকতো প্রাণবন্ত।
• বিখ্যাতদের সান্নিধ্য: মাদার তেরেসা থেকে শুরু করে সৈয়দ মুজতবা আলী, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ এবং কবি আহসান হাবীবের মতো বরেণ্য ব্যক্তিদের শেষ জীবনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই হাসপাতালের দেয়ালে দেয়ালে।
• অসাধ্য সাধন: সীমিত সম্পদের মধ্যেও বছরে প্রায় ৫০ হাজার অপারেশন এবং প্রতিদিন ৫ হাজারেরও বেশি বহির্বিভাগীয় রোগীকে বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার যে রেকর্ড ঢামেক গড়েছে, তা অবিশ্বাস্য। মাহবুব মোতানাব্বি যথার্থই বলেছেন, জরুরি মুহূর্তে রক্ত সংকটে চিকিৎসকদের নিজেদের রক্ত দেওয়ার নজির এখানে নিত্যদিনের ঘটনা।
• যৌক্তিক স্বীকৃতি: তাঁর মতে, এই পুরস্কার বহু আগেই প্রাপ্য ছিল। "Better late than never" উক্তির মাধ্যমে তিনি দেরিতে হলেও এই অর্জনকে স্বাগত জানিয়েছেন।
মাহবুব মোতানাব্বি তাঁর পর্যালোচনায় আরও উল্লেখ করেন, এই পুরস্কার কেবল ঢাকা মেডিকেল কলেজের একার নয়। দেশের পুরনো সব সরকারি মেডিকেল কলেজ যে অমানুষিক চাপের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছে, ঢামেক-এর এই অর্জন সেই সব প্রতিষ্ঠানের পরিশ্রমেরই একটি প্রতীকী স্বীকৃতি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের এই জাতীয় প্রাপ্তি দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রতিটি কর্মীর জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। অব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করার এই ধারা ভবিষ্যতে আরও সুসংহত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।