যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের আসল নাম 'ইলহান নূর সাইদ এলমি'। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট দুই অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে এমন দাবি করেছে ফক্স নিউজ ডিজিটাল। ওমরের দপ্তর এ দাবিকে 'সম্পূর্ণ মিথ্যা' বলেছে।
এ দাবি সামনে এসেছে ১২ অক্টোবর ভোরে ওয়াশিংটন ডিসিতে ওমরের বাড়িতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের (এইচএসআই) কর্মকর্তাদের তল্লাশির পর। সরকার শুধু বলেছে, তল্লাশিটি 'চলমান একটি ফেডারেল ফৌজদারি তদন্তের অংশ'। কী অপরাধের সন্দেহে তল্লাশি, তা জানানো হয়নি।
ফক্স নিউজ ডিজিটাল জানিয়েছে, ওমরের অভিবাসন নথি পূরণের সময় তিনি নিজে বা তাঁর বাবা জালিয়াতি করেছিলেন কি না, ফেডারেল তদন্তকারীরা তা খতিয়ে দেখছেন। এ তথ্য অবশ্য সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
ইলহান ওমরের আসল নাম নিয়ে আদালতের নথি ও দপ্তর কী বলছে
বুধবার জিনাইন পিরো আদালতে একটি আবেদন করেন। ফক্স নিউজ তাঁকে ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার ইউএস ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হিসেবে উল্লেখ করেছে। কয়েকটি গণমাধ্যম তল্লাশি পরোয়ানা প্রকাশের দাবি জানিয়েছিল। পিরোর আবেদনে পরোয়ানাটি গোপন রাখার অনুরোধ করে বলা হয়েছে, সরকার এখনো পরোয়ানা কার্যকর করার কাজ শেষ করেনি।
ফক্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ওই আবেদনে ওমরকে উল্লেখ করা হয়েছে 'কংগ্রেস সদস্য ইলহান নূর সাইদ এলমি, ওরফে ইলহান আবদুল্লাহি ওমর' হিসেবে। নথিতে কেন 'ওরফে' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, জানতে চাইলে এক সূত্র ফক্সকে বলেন, ওটা তাঁর আসল নাম নয়। রক্ষণশীল ভাষ্যকার উইল চেম্বারলেইন প্রথম আবেদনটি এক্সে প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি অনুমান করেন, বিচার বিভাগ মনে করে ওমর 'মিথ্যা পরিচয়ে' যুক্তরাষ্ট্রে আছেন।
ওমরের এক মুখপাত্র ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, "এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ইলহান ওমরই তাঁর আসল নাম।" ওমর নিজের ভাইকে বিয়ে করেছিলেন বলে যে দাবি ঘুরছে, সেটিও তিনি 'বারবার এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে' অস্বীকার করেছেন এবং এমএস নাউয়ের সাক্ষাৎকারেও আবার অস্বীকার করেছেন বলে মুখপাত্র জানান।
নাম নিয়ে এ প্রশ্ন কেন গুরুত্বপূর্ণ, তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন মিনেসোটার সাবেক ফেডারেল অভিবাসন বিচারক নাথান হ্যানসেন। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ওমর ছদ্মনামে জীবন কাটিয়েছেন বলে আদালতে প্রমাণিত হলে তাঁর পূরণ করা প্রতিটি ফরমই 'প্রশ্নবিদ্ধ' হয়ে উঠতে পারে।
ইলহান ওমরের বাড়িতে তল্লাশি: কী জব্দ হয়েছে
তল্লাশির পর প্রথম প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে ওমর এমএস নাউকে বলেন, স্থানীয় সময় সকাল ছয়টার দিকে কর্মকর্তারা দরজায় 'ধাক্কাতে' শুরু করেন। তখন তিনি ও তাঁর স্বামী বিছানায় ছিলেন। বিবিসি জানিয়েছে, ওমরের হিসাবে ১৫ থেকে ২৫ জন কর্মকর্তা বাড়িটি ঘিরে ফেলেছিলেন। তিনি পরোয়ানা দেখতে চাইলে দরজাতেই তা দেখানো হয়।
ওমরের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ ঘণ্টা তল্লাশির পর কর্মকর্তারা মোট ১৭টি জিনিস নিয়ে যান। এর মধ্যে আছে:
- একাধিক মুঠোফোন, যার মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত ফোনও রয়েছে
- নোটবুক
- তাঁর স্বামীর ১৯৬০-এর দশকের একটি ক্যামেরা
- পাসপোর্ট
- ব্যক্তিগত কম্পিউটার (প্রতিবেদন অনুযায়ী)
ফক্স নিউজ ডিজিটাল আরও জানিয়েছে, তল্লাশির সময় তদন্তকারীরা ওমরের ডিএনএ সংগ্রহ করেছেন। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, তদন্তের অংশ হিসেবে ওমরের পরিবারের সদস্যদের এক ডজনের বেশি সমন পাঠানো হয়েছে। ফক্সের খবর অনুযায়ী, ওমরের বোন সাহরা নূরকেও গত সপ্তাহে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
ইলহান ওমর কি অভিযুক্ত? নাগরিকত্ব নিয়ে কী জানা যায়
ওমরের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়নি। ফক্স নিউজও উল্লেখ করেছে, কৌঁসুলিদের উপস্থাপিত বিষয়গুলো এখনো কেবল অভিযোগ। বিবিসি জানিয়েছে, সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তা এর আগে বিভিন্ন মন্তব্যে ওমরের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সরকারি জীবনীতে ওমরের জন্মতারিখ ১৪ অক্টোবর ১৯৮২ এবং জন্মস্থান সোমালিয়ার মোগাদিশু লেখা আছে। তাঁর জন্মসনদ নেই বলে তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। দুই সংবাদমাধ্যমের বিবরণে কিছুটা পার্থক্য আছে। ফক্স জানিয়েছে, ওমরের ভাষ্য অনুযায়ী ১৯৯৫ সালে নাবালিকা অবস্থায় পরিবারের সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত সোমালিয়া থেকে শরণার্থী হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। বিবিসির তথ্যমতে, কেনিয়া থেকে আসার পর ২০০০ সালে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব পান।
ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
তল্লাশির পরপরই ওমর এক বিবৃতিতে একে 'ক্ষমতার জঘন্য অপব্যবহার' এবং 'রাজনৈতিক শত্রুদের নিশানা করতে ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার' বলে অভিহিত করেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তদন্তটিকে 'অত্যন্ত ন্যক্কারজনক' বলেছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এতে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে বলেছেন, তদন্তের সঙ্গে 'আমার কোনো সম্পর্ক নেই'। ওহাইওর এক সমাবেশে তিনি বলেন, "ওরা এটা নিয়ে কী করছে আমি জানি না, তবে এটুকু বলতে পারি: সে একটা বিপর্যয়।" জবাবে ওমর বলেন, "এর সঙ্গে তাঁর সবকিছুরই সম্পর্ক আছে।" তাঁর দাবি, বিরোধের শুরু ২০১৯ সালে, যখন ট্রাম্প তাঁকে ফেরত পাঠানো বা বিতাড়নের কথা বলেছিলেন।
ওমর জানিয়েছেন, তল্লাশিতে তাঁর ঠিকানা প্রকাশ হয়ে পড়েছে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। তাই তিনি আর ওয়াশিংটনের বাড়িটিতে থাকতে পারবেন না। "যে ধরনের হত্যার হুমকি আমাকে সামলাতে হয়, তাতে ওই বাড়িতে সন্তানদের নিয়ে থাকা আর সম্ভব নয়," বলেন তিনি।
দ্য হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বিবিসিকে বিচার বিভাগের কাছে পাঠালেও বিচার বিভাগের বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফক্স নিউজ ডিজিটালের অনুরোধেও সাড়া দেননি ওমরের আইনজীবীরা। পরোয়ানা প্রকাশ করা হবে, নাকি পিরোর আবেদন মেনে তা গোপন থাকবে, সে বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত এখনো বাকি।