আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) সাবেক বিচারক ও জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার হাইকমিশনার নাভানেথেম "নাভি" পিল্লে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের অসলোতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়, জানিয়েছে সিএনবিসি।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ার ইয়র্গেন ভাটনে ফ্রিডনেস বলেন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে পিল্লে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সিএনবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরস্কার ঘোষণার সময় তিনি বলেন, "Navi Pillay has been at the forefront of the development of international law for decades" — অর্থাৎ নাভি পিল্লে কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক আইনের অগ্রগতির সামনের সারিতে ছিলেন।
নোবেল কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "In all the positions she has held, she has stressed the responsibility of individuals and states to comply with the rule of law" — তিনি যে পদেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সব জায়গায় আইনের শাসন মেনে চলার ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার ওপর জোর দিয়েছেন। কমিটি আরও বলেছে, "Navi Pillay has held states and national leaders accountable and brought hope to victims of violence and conflict" — পিল্লে রাষ্ট্র ও জাতীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় এনেছেন এবং সহিংসতা ও সংঘাতের শিকারদের আশা জাগিয়েছেন।
আপার্টহেইড ডারবান থেকে হেগ
আপার্টহেইড যুগে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক ভারতীয় তামিল পরিবারে জন্ম নেন পিল্লে। নাটাল প্রদেশে আইন ব্যবসা শুরু করা প্রথম অ-শ্বেতাঙ্গ নারী তিনি; সেই সময় আপার্টহেইডবিরোধী কর্মী ও রাজবন্দিদের পক্ষে লড়েছেন। আপার্টহেইডের অবসানের পর দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পান।
১৯৯৫ সালে তিনি রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক ফৌজদারি ট্রাইব্যুনালে (আইসিটিআর) যোগ দেন। সেখানে তাঁর সভাপতিত্বে পরিচালিত যুগান্তকারী মামলাগুলোতে গণহত্যার অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণকে আইনত স্বীকৃতি দেওয়া হয় — যা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনে নতুন নজির স্থাপন করে। ২০০৩ সালে তিনি হেগভিত্তিক আইসিসির প্রথম বেঞ্চের বিচারক নির্বাচিত হন এবং ২০০৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার হিসেবে
২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ছিলেন পিল্লে। সিএনবিসি ও ইউএস বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মেয়াদে তাঁর দপ্তর সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করে, শ্রীলঙ্কায় তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযানে জবাবদিহির দাবি তোলে এবং জিনজিয়াংয়ে উইগরদের প্রতি চীনের আচরণের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়।
৮৩ বছর বয়সী পিল্লে এখনো উপদেষ্টামূলক ভূমিকা ও জনবক্তব্যের মাধ্যমে মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন।
পিল্লের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধের সম্পর্ক কী
দক্ষিণ এশিয়ার পাঠকের কাছে এই পুরস্কার বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁর তামিল বংশোদ্ভূত পরিচয় এবং আইসিটিআর ও আইসিসিতে প্রতিষ্ঠিত আইনি নজির ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় কাজে লাগতে পারে — যেসব মামলার বিচার এখনো বড় অংশে হয়নি।
এই পুরস্কার এমন এক সময়ে এলো, যখন আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা চাপের মুখে রয়েছে। ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নে হিমশিম খাচ্ছে, আর বড় সংঘাতগুলোতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অচলাবস্থায় রয়েছে।
পুরস্কারের অঙ্ক ও অসলোতেই কেন
সিএনবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে নোবেল বিজয়ীরা পাবেন ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (১.২ মিলিয়ন ডলার)। আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুযায়ী, এই পুরস্কার প্রতি বছর সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়, যিনি "জাতিগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের জন্য সর্বাধিক বা সর্বোত্তম কাজ" করেছেন; বিজয়ী নির্বাচন করেন নরওয়ের সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত কমিটি। এ কারণেই শান্তি পুরস্কারের ঘোষণা ও অনুষ্ঠান হয় নরওয়ের অসলোতে।
তবে পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্তে পিল্লের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি বলে জানান ফ্রিডনেস। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "My message to her would be 'if you see a Norwegian number calling, please pick up'" — অর্থাৎ তার প্রতি আমার বার্তা হবে, নরওয়েজিয়ান নম্বর থেকে ফোন এলে ধরবেন। পিল্লের প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।
গত বছরের শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো, যিনি পরে তাঁর পুরস্কার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দিয়েছিলেন। নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, পুরস্কার প্রত্যাহার, ভাগ বা হস্তান্তর করা যায় না। ট্রাম্প বুধবার পুরস্কারের জন্য নতুন করে দাবি তুলে বলেন, তিনি আটটি যুদ্ধের নিষ্পত্তি করেছেন।