রিয়াদ ও ঢাকা। ১৫ মে, ২০২৬: সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সংবাদ প্ল্যাটফর্মে "সৌদি আরব কয়েক হাজার কাজের ভিসা বাতিল করেছে" শীর্ষক একটি তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশি প্রবাসী এবং গমনেচ্ছু কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার বিশ্লেষক এবং সৌদি আরবের মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের (MHRSD) কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিষয়টি 'ভিসা বন্ধ' হওয়া নয়, বরং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল সংস্কার ও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের অংশ।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রিয়াদ ও জেদ্দাসহ বড় শহরগুলোতে কিছু নির্দিষ্ট সেক্টরের ভিসা প্রসেসিং থমকে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। এর প্রেক্ষিতে ছড়িয়ে পড়া "হাজারো ভিসা বাতিল"-এর খবরটি আংশিক সত্য কিন্তু প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
প্রকৃতপক্ষে যা ঘটছে তা হলো, সৌদি কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক জাল বা 'ফেক' অফার লেটার শনাক্ত করেছে। এসব ভুয়া ডকুমেন্টের বিপরীতে করা আবেদনগুলো সরাসরি বাতিল করা হচ্ছে।
কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে যারা কোটার অতিরিক্ত কর্মী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এছাড়াও 'ভিশন ২০৩০' অর্জনে সৌদি সরকার এখন দক্ষ কর্মীর ওপর জোর দিচ্ছে। যারা অদক্ষ হয়েও টেকনিক্যাল ভিসায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের আবেদনগুলো বিশেষ স্ক্রিনিংয়ের মুখে পড়ছে।
সৌদি আরবের শ্রম মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কঠোরতার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য কাজ করছে আর সেগুলো হচ্ছে, মানবপাচার ও অবৈধ দালাল চক্র রোধ: "ফ্রি ভিসা" নামক অবৈধ প্রথা চিরতরে বন্ধ করতে সরাসরি কোম্পানি বা কফিলের মাধ্যমে যাচাইকৃত আবেদন ছাড়া অন্যগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে না। শ্রমবাজারের স্বচ্ছতা:নিবন্ধিত পোর্টাল 'কিউয়া' (Qiwa) এবং 'মুসানেদ' (Musaned)-এর মাধ্যমে প্রতিটি চুক্তি ডিজিটালভাবে যাচাই করা হচ্ছে।ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়ন: সৌদিকরণ এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য কেবল যোগ্য ও দক্ষ জনশক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: অপরাধ প্রবণতা কমাতে কর্মীদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক এবং বায়োমেট্রিক ডেটা যাচাই আরও নিবিড় করা হয়েছে।
ভিসা বাতিলের খবরের ভিড়ে ইতিবাচক দিক হলো, নির্দিষ্ট কিছু খাতে কর্মী নিয়োগের গতি বেড়েছে। বিশেষ করে নির্মাণ শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, এবং প্রযুক্তি খাতে বিপুল সংখ্যক দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। তবে গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন নিরাপত্তা বিধিমালা যুক্ত হয়েছে।
শ্রমবাজার বিশ্লেষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো "ভিসা সংকট" নয়, বরং একটি "নীতিগত সংস্কার"। তারা বলেছেন, "বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে যাওয়ার ক্ষেত্রে অখ্যাত দালালের চেয়ে অনুমোদিত এজেন্সির ওপর নির্ভর করা জরুরি। আবেদনকারীকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে তার নিয়োগপত্রটি 'কিউয়া' পোর্টালে নিবন্ধিত কি না। কোনো অতিরঞ্জিত খবরে আতঙ্কিত না হয়ে বৈধ নথিপত্র যাচাই করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।"
পরিশেষ, সৌদি আরব কাজের ভিসা বন্ধ করেনি; বরং দেশটি তাদের শ্রমবাজারকে বিশৃঙ্খলা ও জালিয়াতিমুক্ত করার চেষ্টা করছে। "হাজার হাজার ভিসা বাতিল" হওয়ার দাবিটি মূলত পদ্ধতিগত কঠোরতার একটি অতিরঞ্জিত রূপ। বৈধ এবং দক্ষ কর্মীদের জন্য সৌদির শ্রমবাজার এখনো বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গন্তব্য হিসেবে উন্মুক্ত রয়েছে।