সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হুতিদের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের পর তাদের ধ্বংসাবশেষ আবাসিক এলাকায় পড়ে চারজন আহত হয়েছেন এবং ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, মঙ্গলবার এমনটাই জানিয়েছে দেশটির সিভিল ডিফেন্স।
সিএবিএস নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি সৌদি প্রেস এজেন্সি জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে দুই নারী, এক পুরুষ ও এক শিশু রয়েছে। একই দিনে পূর্ব প্রদেশে তেল জায়ান্ট আরামকোর একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা হয়; সৌদি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় জানায়, একটি প্রশাসনিক ভবনে সীমিত আগুন লাগলেও কেউ আহত হয়নি।
ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তেহরানে হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের এই সর্বশেষ উত্তাপ এখন আর ইয়েমেন বা ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি সরাসরি ছুঁয়ে দিচ্ছে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো, বিমান চলাচল এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিকে।
সৌদি জোটের পাল্টা হামলা ও হুতি হুমকি
হুতিদের এই হামলাকে সৌদি জোট বছরগুলোর মধ্যে রাজ্যের মাটিতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে। জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট মঙ্গলবার পশ্চিম ইয়েমেনের রাজধানী সানা, ধামার ও সাদা প্রদেশের তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, সিএবিএস নিউজ জানায়।
জোটের মুখপাত্র তুরকি আল-মালিকি এক্স-এ লিখেছেন, হামলার লক্ষ্য ছিল এমন স্থাপনা, যা হুতিরা ব্যবহার করছে তাদের "যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সরবরাহ" করতে এবং "রাজ্য, ইয়েমেন, দক্ষিণ লোহিত সাগর ও জলপথকে হুমকির" মুখে ফেলতে।
জোট পূর্ব সৌদি আরবের জাহরানে নিক্ষেপ করা হুতিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের কথাও জানায়; সেখানে আরামকোর সদর দপ্তর রয়েছে। আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয় পূর্ব প্রদেশের হারাদ শহর লক্ষ্য করে আসার সময়।
সৌদি বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা
হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর মঙ্গলবার ঘোষণা করেছে, সৌদি আরবের যেকোনো বিমানবন্দর ব্যবহারে সরকারি কর্মচারীদের মিশন প্রধানের বিশেষ অনুমতি নিতে হবে।
সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, "যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিমানবন্দরে সম্ভাব্য হামলা, ফ্লাইট বাতিল, আকাশসীমা বন্ধ এবং ভ্রমণে বিঘ্নের ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত।"
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। জেদ্দা ও দাম্মামের বিমানবন্দর চালু থাকলেও সেখানে ফ্লাইটে বিলম্ব ও বাতিল হচ্ছে।
- সৌদিতে কর্মরত যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মচারীরা ইয়েমেন সীমান্তের ২০ মাইলের মধ্যে যেতে পারবেন না।
- জিজান, আসির, নাজরান প্রদেশ এবং কাতিফ, ইয়ানবু ও তায়েফ শহরে ভ্রমণে বিশেষ অনুমতি লাগবে।
- রিয়াদে আহত হয়েছেন ৪ জন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫টি বাড়ি।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলা
এদিকে হরমুজ প্রণালীতে অজ্ঞাত উৎস থেকে নিক্ষেপ করা প্রজেক্টাইলের আঘাতে একটি ট্যাংকার ও একটি কন্টেইনার জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের নৌ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স। ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কোনো তথ্য না দিয়ে সংস্থাটি জানায়, তদন্ত চলছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান প্রণালীটির নিয়ন্ত্রণ দাবি করে আসছে এবং তার অনুমতি ছাড়া পার হওয়ার চেষ্টাকারী জাহাজগুলোকে নিয়মিত লক্ষ্য করছে। জবাবে ওয়াশিংটন ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।
ট্রাম্প হামলাকে নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত করলেন
হুতিদের এই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তেলের দাম বাড়ানোর ইচ্ছাকৃত চেষ্টা বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, জানায় আল জাজিরা।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, "তারা [হুতিরা] অনেকদিন নীরব ছিল, কিন্তু এখন আবার বেরিয়ে এসেছে, সম্ভবত ইরানের ইশারায়, ইরান একটি ব্যর্থ জাতি, যাদের নৌবাহিনী নেই, বিমানবাহিনী নেই, বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ অর্থনীতি এবং ৩০১ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি, খুবই জঘন্য উপায়ে সৌদি আরবে আঘাত হানছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে, সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে।"
তিনি আরও বলেন, "কেউ তাদের [হুতিদের] বুঝিয়ে বলুক যে আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি না, আমি ইতিমধ্যে জিতেছি, বিপুল ব্যবধানে, কিন্তু নির্বাচনের পর আমি থাকব, এবং আমি কখনো ভুলব না!" সঙ্গে সঙ্গে তিনি নির্বাচনের পর মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হামলা বাড়ানোর হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ওপর যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এপি-এনওআরসি জরিপে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, এই যুদ্ধ করা যুক্তিসঙ্গত ছিল না। ডেমোক্র্যাটরা এই অসন্তোষ কাজে লাগিয়ে কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আশা করছে।
এখন মূল প্রশ্ন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বা পরে যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলায় যোগ দেবে কি না; হরমুজে দুই জাহাজে কে হামলা চালিয়েছে তাও এখনো অজানা। আর ১৭ অক্টোবরের পর রিয়াদের বিমানবন্দর সত্যিই খুলবে কি না, তা-ও দেখতে হবে।