আর্কাইভ ভিডিও ই-পেপার
ব্রেকিং নিউজ
সাফল্যের গল্প

আকাঙ্ক্ষা থেকে প্রভাব: চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ এবং কমিউনিটি চ্যাম্পিয়ন ড. সাফি ভূঁইয়ার অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা

38 1 min read fb x
আকাঙ্ক্ষা থেকে প্রভাব: চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ এবং কমিউনিটি চ্যাম্পিয়ন ড. সাফি ভূঁইয়ার অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা
আকাঙ্ক্ষা থেকে প্রভাব: চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ এবং কমিউনিটি চ্যাম্পিয়ন ড. সাফি ভূঁইয়ার অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা

টরন্টো, ওন্টারিও – ‘কানাডিয়ান ড্রিম’ বা কানাডীয় স্বপ্নের আখ্যানে ড. সাফি ভূঁইয়ার গল্পের মতো খুব কম গল্পই এতটা জোরালোভাবে অনুরণিত হয়। একজন চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ এবং কমিউনিটি চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এই বাংলাদেশি-কানাডীয় নেতা কানাডার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মূলধারায় অভিবাসী মেধা ও দক্ষতাকে একীভূত করার ধারণাটিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছেন।

২০১৮ সালে 'আরবিসি টপ ৭৫ কানাডিয়ান ইমিগ্র্যান্টস'-এর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃত অধ্যাপক ভূঁইয়ার যাত্রা—বাংলাদেশের একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী থেকে জনস্বাস্থ্যের একজন বৈশ্বিক কর্তাব্যক্তি হয়ে ওঠা—নেতৃত্ব, স্থিতিস্থাপকতা এবং সেবার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করে।

ড. ভূঁইয়ার একাডেমিক পটভূমি তার শ্রেষ্ঠত্বের নিরন্তর প্রচেষ্টাকে প্রতিফলিত করে। মূলত বাংলাদেশে চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিলেও তিনি আন্তর্জাতিকভাবে তার দক্ষতা প্রসারিত করেছেন। তিনি ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি (PhD), মাহিদল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএইচ (MPH) এবং টরন্টো মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি (TMU) থেকে এমবিএ (MBA) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথ থেকে স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন।

এই বহুমুখী শিক্ষা তাকে একটি স্পষ্ট লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছে: আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষিত স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের (IEHP) জ্ঞান এবং দক্ষতা যাতে বৃথা না যায় তা নিশ্চিত করা।

তিনি কানাডার স্বাস্থ্যসেবা কর্মীবাহিনীতে অভিবাসী পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করার একজন দৃঢ় প্রবক্তা। ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো এবং টিএমইউ-তে (TMU) তিনি তিনটি উদ্ভাবনী স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, যা এই অভিবাসী স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের কানাডীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।

ড. ভূঁইয়া বলেন, “শিক্ষাই হলো সমাধান। ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা শক্তিশালী, এবং আমরা সম্মিলিতভাবেই সামনে এগিয়ে চলি।”

তার কাজের প্রভাব পরিমাপযোগ্য। গত এক দশকে তিনি প্রতি বছর ৫০ জনেরও বেশি পেশাজীবীকে মেন্টরশিপ প্রদান করেছেন, যা চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের একাডেমিয়া, সরকার এবং ক্লিনিকাল প্র্যাকটিসে নিজেদের ক্যারিয়ার পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে।

একাডেমিক জগতের বাইরেও ড. ভূঁইয়ার প্রভাব মানবিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিস্তৃত। যেমন—মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য: ‘এমসিএইচ হ্যান্ডবুক’ (MCH Handbook) বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিটির কো-লিডার হিসেবে তিনি কানাডার অভিবাসী এবং সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর জন্য সাংস্কৃতিকভাবে উপযুক্ত স্বাস্থ্য সরঞ্জাম তৈরিতে কাজ করছেন। কমিউনিটি হেলথ: ১৯৮৬ সাল থেকে লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের সদস্য হিসেবে তিনি 'টরন্টো গ্লোবাল ডক্টরস লায়ন্স ক্লাব' সহ-প্রতিষ্ঠা করেন এবং ডায়াবেটিস সচেতনতা ও প্রতিরোধে বড় ধরনের প্রচারণার নেতৃত্ব দেন। প্যান্ডেমিক রেসপন্স: ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর প্যান্ডেমিক ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা অনুষদ সদস্য হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী সংকটের সময় কোভিড-১৯ কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণে বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব প্রদান করেন।

তার এই অবদানসমূহ ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। তার অর্জিত সম্মানের মধ্যে রয়েছে—টিচিং এক্সিলেন্সের জন্য 'ক্যারিয়ার ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড', 'সাউথ এশিয়ান ডায়াসপোরা চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড', 'লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্টের ডিস্টিংগুইশড লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড' এবং 'হেলেন কেলার ফেলোশিপ'।

ড. ভূঁইয়ার গল্পের শুরু বাংলাদেশের ঢাকায়, যেখানে তিনি সামাজিক মূল্যবোধ এবং ধৈর্যশীলতার এক গভীর সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠেন। তার শুরুর বছরগুলো একাডেমিক শৃঙ্খলা এবং সমাজসেবার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল।

তার চিকিৎসা জীবন শুরু হওয়ার আগেই তিনি একজন সিভিল সোসাইটি নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিক্ট ৩১৫এ-র 'লিও ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট' হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই তিনি তার জীবনের মূলমন্ত্র “সুশিক্ষায় আলোকিত জাতি” (Education for a Brighter Nation) প্রবর্তন করেন—যে দর্শনটি পরবর্তীতে কানাডায় তার প্রবাস জীবনের কাজগুলোকেও পরিচালিত করেছে।

তিনি ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (HSC) সম্পন্ন করেন এবং ১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস (MBBS) ডিগ্রির জন্য ভর্তি হন। ১৯৯৩ সালে ইন্টার্নশিপ শেষ করে ১৯৯৪ সালে তিনি তার চিকিৎসা পেশা শুরু করেন।

পরবর্তীতে তিনি এসমা (Esma) সোসাইটি এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাথে কাজ করেন। সরকারি চাকরির মাধ্যমে তিনি গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলায় মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে তিনি ঢাকার আজিমপুর মাতৃসদন হাসপাতাল পুনর্গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। আধুনিক ‘ম্যাটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’ (MCHTI) উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতায় বাংলাদেশের লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবেও কাজ করেন তিনি, যা ২০০০ সালে চালু হয়।

এছাড়াও, তিনি ২০০১ সাল পর্যন্ত দেশের ছয়টি বিভাগের সিটি কর্পোরেশনগুলোতে 'আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার'-এর জন্য কারিগরি সহায়তা প্রদানকারী ইএএন (EAN) পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছেন।

ঢাকার একজন তরুণ নেতা থেকে কানাডার একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক হিসেবে ড. ভূঁইয়ার এই রূপান্তর তার 'গ্লোবাল মাইন্ডসেট' বা বৈশ্বিক চিন্তাধারার প্রতিফলন। তার বাংলাদেশি শেকড়কে উন্নত আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সাথে যুক্ত করে তিনি কানাডীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক অনন্য সম্পদে পরিণত হয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন অভিবাসী চিকিৎসক থেকে জাতীয় স্তরের অবদানকারী হয়ে ওঠার পথটি আজীবন শিক্ষা এবং সেবার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়।

বর্তমানে তিনি পরবর্তী প্রজন্মকে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন, যাতে একসময় ঢাকার একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজ কানাডার মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এক স্থায়ী ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সম্পর্কিত সংবাদ

Advertisement

Advertisement


ধন্যবাদ!

আপনার ইনবক্সে সর্বশেষ খবর পাঠানো হবে।

নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইমেইলে পান।

যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।