বাংলাদেশের সংবিধানে সংসদ সদস্যদের জনগণের প্রতিনিধি, আইনপ্রণেতা এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিতকারী হিসেবে উপস্থাপনা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সংবিধান যা উপস্থাপন করেছে আর রাজনৈতিক চর্চা যা করছে, তার মধ্যে বিস্তর ফারাক। সংসদ সদস্যরা আজ অনেক ক্ষেত্রেই সাংবিধানিক প্রতিনিধি নন; তাঁরা ক্ষমতার রাজনীতির অংশ, কখনো কখনো আবার রাজনৈতিক ক্ষমতার দালাল। নতুন সরকার গঠনের পূর্বে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের যোগ্যতা যাচাই করা জরুরি। সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ সম্পর্কে তাঁদের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও উপলব্ধি রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা অত্যন্ত প্রয়োজন।
সংসদ সদস্যদের ভূমিকা ক্রমশ আইন প্রণয়নের সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাব বিস্তারের এক অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। জনগণও তাঁদের কাছ থেকে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার ব্যবস্থাপনা কিংবা উন্নয়ন প্রকল্পে হস্তক্ষেপের মতো অসাংবিধানিক প্রত্যাশা পোষণ করছে। এই বিকৃত চর্চা আজ রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীরে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে এই ক্যানসার অবিলম্বে নির্মূল করতে হবে—অন্যথায় দেশের শাসনব্যবস্থা আর কখনোই সুস্থ পথে ফিরবে না।
বাংলাদেশের সংবিধানে আইন প্রণয়নের পূর্ণ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে দেওয়া হয়েছে। সংসদ হওয়ার কথা ছিল জাতির সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মঞ্চ। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ আইন সংসদের বাইরে রচিত হয়—মন্ত্রণালয়ের কক্ষে—এবং সংসদে তা প্রায় বিনা প্রশ্নে অনুমোদিত হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, অধিকাংশ আইন মন্ত্রণালয়ে তৈরি হয় এবং প্রায় কোনো আলোচনা ছাড়াই পাস হয়। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যত দুর্বল। দলীয় শৃঙ্খলা ও মনোনয়ন-নির্ভর রাজনীতি সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশ নিরুৎসাহিত করে।
বিরোধী দলের সংসদ বর্জন, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং বিতর্কের অভাব সংসদকে দুর্বল করেছে বাব বার। শক্তিশালী সংসদ ছাড়া কার্যকর গণতন্ত্র সম্ভব নয়।
সত্যিকার্থে সমস্যা সংবিধানে নয়; সমস্যা আসলে তার প্রয়োগে। সাংবিধানিক চেতনা ফিরিয়ে আনতে হলে দলীয় গণতন্ত্র, শক্তিশালী কমিটি এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি সংসদের কাছে থাকার কথা। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ করার সাংবিধানিক দায়িত্ব সংসদ সদস্যদের। কিন্তু বাস্তবে মন্ত্রীদের জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যত নিষ্ক্রিয়। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা নীতিগত ব্যর্থতা নিয়ে সংসদে কার্যকর আলোচনা খুব কমই দেখা যায়। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের নীরবতা যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো—সংসদ সদস্যদের ভূমিকা আইনপ্রণেতা থেকে সরে গিয়ে স্থানীয় ক্ষমতার মধ্যস্থতাকারীতে রূপ নিয়েছে। আজ বহু সংসদ সদস্যের প্রধান কাজ আইন তৈরি নয়, বরং রাস্তা, টেন্ডার, প্রকল্প, পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার। ভোটাররাও তাঁদের কাছ থেকে আইন বা নীতি নয়, ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধান ও প্রভাব খাটানোর প্রত্যাশা করেন। ফলে সংসদ সদস্যরা জাতীয় নীতিনির্ধারক না হয়ে স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিরোধী রাজনীতির দুর্বলতা। সংসদ বর্জনের রাজনীতি সংসদকে আরও নিস্তেজ করেছে। শক্তিশালী ও সক্রিয় বিরোধী দল ছাড়া সংসদ গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে না। একদলীয় প্রভাব সংসদকে বিতর্কহীন, প্রশ্নহীন এবং কার্যত অকার্যকর করে তোলে।
সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। দলীয় নেতৃত্বের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, মনোনয়ন হারানোর ভয় এবং নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরতা সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা সংকুচিত করেছে। অনেক সংসদ সদস্য সংবিধানের প্রতি নয়, বরং দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যকেই প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করেন।
এই পরিস্থিতির ফল সুদূরপ্রসারী। সংসদ যখন তার সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়, তখন গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় নির্বাহী বিভাগের হাতে, নাগরিকদের সংসদের প্রতি আস্থা কমে যায়, আর রাজনীতি নীতিনির্ধারণের বদলে পৃষ্ঠপোষকতার খেলায় পরিণত হয়।
বাংলাদেশের সমস্যা সংবিধানে নয়। সমস্যা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, দলীয় কাঠামোর ভেতরে গণতন্ত্রের অভাবে এবং সংসদকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করে রাখার প্রবণতায়। যদি সংসদকে সত্যিকারের জাতীয় সিদ্ধান্তের মঞ্চ হিসেবে পুনরুদ্ধার করতে হয়, তবে সংসদ সদস্যদেরও তাঁদের সাংবিধানিক ভূমিকায় ফিরে যেতে হবে। নচেৎ শক্তিশালী ব্যক্তিরা থাকবেন, কিন্তু শক্তিশালী সংসদ আর গড়ে উঠবে না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত।
তাত্ত্বিকভাবে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব হলো—প্রস্তাবিত আইন (বিল) নিয়ে আলোচনা করা, প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন, অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করা, জনস্বার্থ ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতিফলন নিশ্চিত করা, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা করা। এক কথায় জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান মঞ্চ হওয়ার কথা সংসদেরই।
অপরদিকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৫–৫৮ অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারি জরুরী-বাংলাদেশ একটি সংসদীয় শাসনব্যবস্থার দেশ। ফলে নির্বাহী বিভাগ—অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা—সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের প্রধান দায়িত্ব হলো—মন্ত্রীদের নীতিনির্ধারণ ও কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করা, সরকারি ব্যয়ের উপর নজরদারি রাখা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং প্রধানমন্ত্রীকে কার্যকরভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সংসদের হাতে রয়েছে প্রশ্নোত্তর পর্ব, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, পাশাপাশি প্রস্তাব উত্থাপন, বিতর্ক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাংবিধানিক ক্ষমতা।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই সাংবিধানিক কাঠামো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকেছে। এখানে প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে গেলেই তা প্রায় রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো—যার পরিণতি হতো গুম, নিখোঁজ কিংবা তথাকথিত ‘আয়নাঘর’-এর অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হওয়া। এসব চর্চাই দীর্ঘদিন ধরে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পরিচালিত হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে সংসদ জবাবদিহির কার্যকর মঞ্চে পরিণত হওয়ার বদলে ক্ষমতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের এক নীরব ও নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছিল।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক অনুচ্ছেদ ৮১–৯২ অনুযায়ী সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর আরোপ কিংবা সরকারি অর্থ ব্যয় করা যায় না। এক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব—জাতীয় বাজেট নিয়ে আলোচনা করা, উন্নয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণে ভূমিকা রাখা, সরকারি অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের তদারকি করা।
জনগণের প্রতিনিধিত্ব যদিও কোন নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদে আলাদাভাবে বর্ণিত নয়, তবু জনগণের প্রতিনিধিত্বই সংসদ সদস্যদের মূল গণতান্ত্রিক ভূমিকা। এর মধ্যে রয়েছে—সংসদে নিজ এলাকার সমস্যা উত্থাপন করা, জাতীয় বিতর্কে জনগণের মতামত প্রতিফলিত করা, এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করা
সংবিধান রক্ষা করাও সংসদ সদস্যদের দাযিত্ব। সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণের সময় অঙ্গীকার করেন—সংবিধান সমুন্নত রাখার, গণতন্ত্র রক্ষার, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আইনের শাসন বজায় রাখার। প্রয়োজনে তাঁদের নিজ দলের বিরুদ্ধেও অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং বাংলাদেশের বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ের চিত্র অনুযায়ী সংবিধানের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা ভিন্ন এক বাস্তবতায় পরিচালিত হচ্ছে যুগ যুগ ধরে।
সংসদ কার্যত নির্বাহী বিভাগের অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত। বাস্তবে দেখা যায়—অধিকাংশ আইন মন্ত্রণালয়েই তৈরি হয়, সংসদ সদস্যদের দ্বারা নয়। অল্প আলোচনা বা বিতর্ক ছাড়াই বিল পাস হয়। বিরোধী দল উপস্থিত থাকলেও সীমিত প্রভাব রাখতে পারে। দলীয় শৃঙ্খলা ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আনুগত্য সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশে সুযোগ দেয় না।
প্রকৃত অর্থে নজরদারি দুর্বল বা কার্যত অনুপস্থিত। যেখানে সংসদের সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা—সেখানে মন্ত্রীদের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না, সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যকারিতা সীমিত, দুর্নীতির অভিযোগে সংসদীয় পর্যায়ে খুব কমই ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা নিজেদের সরকারের বিরোধিতা প্রায় কখনোই করেনই না।
বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরা আইনপ্রণেতার বদলে স্থানীয় ক্ষমতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। বাস্তবে বহু সংসদ সদস্য কাজ করেন—স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারসুলভ ভূমিকায়, সরকারি সেবা পাওয়ার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে, দলীয় নেটওয়ার্ক ও পৃষ্ঠপোষকতার নিয়ন্ত্রক হিসেবে। আইন প্রণয়নের বদলে তাঁদের মনোযোগ থাকে—রাস্তা, টেন্ডার ও চুক্তি, পুলিশ ও প্রশাসনিক প্রভাব, এবং নিজ নির্বাচনী এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ। ভোটাররাও অনেক সময় তাঁদের আইনপ্রণেতা নয়, সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে দেখেন।
সংসদ সদস্যরা সবসময় ব্যস্ত থাকেন তাঁদের স্থানীয় প্রকল্পে এবং কর্মকর্তাদের ওপর ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারে। সেখানে উপেক্ষিত থেকে যায়—জাতীয় নীতিনির্ধারণ, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, ফলে সংসদ জাতীয় চিন্তার মঞ্চ না হয়ে স্থানীয় স্বার্থের সমষ্টিতে পরিণত হয়।
আরকটি বড় সমস্যা হচ্ছে বিরোধী দলের প্রান্তিকীকরণ ও সংসদ বর্জন। ঐতিহাসিকভাবে—বিরোধী দল প্রায়ই সংসদ বর্জন করেছে। এতে বিতর্ক ও তদারকি দুর্বল হয়েছে এবং একদলীয় প্রভাব গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট করেছে। শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া সংসদ সংবিধানের উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে না।
ভয়, পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণও একটি বড় ব্যপার। বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো—দলীয় নেতৃত্বের সংসদ সদস্যদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ। ভিন্নমত প্রকাশ করলে মনোনয়ন হারানোর আশঙ্কা। সম্পদ ও ক্ষমতার জন্য নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরতা। এক কথায় সংসদ সদস্যরা অনেক সময় সংবিধান বা ভোটারের নয়, দলীয় নেতৃত্বের সেবা করেন।
চলুন বিশ্লেষণ করি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সংসদ এবং সংসদ সদস্যদের ভূমিকায় কী পরিবর্তন এসেছে।
১৯৭২–১৯৭৫: সক্রিয় সংসদ এবং একদলীয় শাসনের সূচনা শুরু হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র স্থাপন করা হয়। প্রথম নির্বাচনী সংসদ গঠিত হয় ১৯৭৩ সালে। এই সময় সংসদ তুলনামূলকভাবে সক্রিয় ছিল এবং দেশ পরিচালনার মূল মঞ্চ হিসেবে কাজ করছিল। তবে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল (BAKSAL) প্রতিষ্ঠা করেন, যা একদলীয় শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে। প্রেসিডেন্টকেন্দ্রিক ব্যবস্থার কারণে সংসদের স্বাধীনতা কার্যত সীমিত হয়ে যায় এবং এটি দ্রুত একদলীয় শাসনের আওতায় চলে যায়।
১৯৭৫–১৯৯০: সামরিক শাসন ও সংসদের দুর্বলতা দেখা দেয়। ১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় সামরিক বা অভ্যুত্থান-সমর্থিত শাসনের আওতায় থাকে, বিশেষত জিয়াউর রহমান ও এরশাদের শাসনামলে। এই সময় সংসদ কার্যক্রমে দুর্বল ছিল। সংসদ সদস্যরা প্রধানত নির্বাহীর সিদ্ধান্ত অনুমোদনকারীর ভূমিকা পালন করতেন। অনেক সময় সংসদীয় অধিবেশন বিরতিতে বা ব্যর্থভাবে শেষ হতো, এবং আইনগুলো প্রায়ই অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে জারি করা হতো, যা সংসদীয় প্রক্রিয়াকে বাইপাস করে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যকর হতো।
১৯৯১–২০০৬: সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি শুরু হয়। ১৯৯১ সালে সহজাত নির্বাচন এবং সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়। সেই সময় সংসদ আবার কার্যকরভাবে কাজ করতে শুরু করে। তবে একই সময়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতিও দেখা যায়। তারা প্রায়শই অধিবেশন বর্জন করত বা বিরোধমূলক অবস্থান নিত, যার ফলে সংসদে পূর্ণমর্যাদার আলোচনার সুযোগ সীমিত হতো।
২০০৯–বর্তমান: শক্তিশালী নির্বাহী ও স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে সংসদ সদস্যরা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বড় জয় লাভ করে এবং শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকেন। এই সময় ক্ষমতাশালী নির্বাহী শৃঙ্খলা সংসদীয় কার্যক্রমকে সীমিত করে, বিরোধী দলের উপস্থিতি ও প্রভাবও কমে যায়। এ পরিস্থিতিতে অনেক সংসদ সদস্য আইনপ্রণেতা হিসেবে নয়, বরং স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে রূপ নেয়, এবং নির্বাচনী অঞ্চলের প্রকল্প ও প্রশাসনিক প্রভাবের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রকে গভীর ও সুদূরপ্রসারী ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক মেরুকরণ, নির্বাচনকেন্দ্রিক অবিশ্বাস এবং সরকার–বিরোধী সংঘাতের সংকটে আক্রান্ত। এই প্রেক্ষাপটে ২০১১ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ওই বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন অবস্থায় সংবিধানের ১৫তম সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচনী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে—যা দেশের ক্ষমতার ভারসাম্য ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মৌলিকভাবে বদলে দেয়।
নির্বাচনী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৯৯৬ সালে ১৩তম সংশোধনের মাধ্যমে প্রবর্তিত হয়। এর অধীনে, অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতি নেতৃত্বে একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার সাধারণ নির্বাচন পরিচালনা করত। এটি সরকারকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা কমাত এবং বিরোধী দলকে নির্বাচনের স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা দিত। কিন্তু ২০১১ সালে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ১৫তম সংশোধনের মাধ্যমে ১৩তম সংশোধনী বাতিল করে নির্বাচনী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা শেষ করে। সরকার বলেছিল এটি সাংবিধানিকভাবে অসঙ্গত, তবে সমালোচকরা মনে করেন এটি রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। নিরপেক্ষ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক থাকায় ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, যা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা হ্রাস করে।
নির্বাচনী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের ফলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও জনগণের বিশ্বাসের উপর প্রভাব পড়ে এবং বিরোধী দলগুলি নির্বাচনের ন্যায্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। সরকারী সংস্থান ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ক্ষমতাসীন দলের সুবিধার্থে ব্যবহার হওয়ার অভিযোগ বেড়ে যায়। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর নিশ্চিত হওয়ার প্রচলন দুর্বল হয়ে যায়।
নির্বাচনী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের ফলে ক্ষমতাসীন দলের প্রাধান্য বেড়ে গিয়েছিলো। বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা বোধ করেছিলো এবং সংসদে কার্যকর প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের উপস্থিত করতে ব্যার্থ হয়েছিলো। ফলশ্রুতিতে: লেজিসলেটিভ জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো এবং নীতিনির্ধারণও একপাক্ষিক হয়ে গিয়েছিলো। এতে রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র হয়েছিলো। এতে দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক ক্ষতি এবং একদলীয় আধিপত্যের প্রবণতা বৃদ্ধি হয়েছিলো। ভোটারদের নীরবতা ও হতাশা বেড়ে গিয়েছিলে। এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিলো।
এক কথায়, নির্বাচনী তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে আওয়ামী লীগ দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। যদিও এটি পার্টির স্বল্পমেয়াদী ক্ষমতাসূচক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও সংসদের কার্যকারিতা দুর্বল হয়েছে, রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়িয়েছে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে ত্বরান্বিত করেছে। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধাক্কা।