সৈয়দ ফারুক হোসেন। ঢাকা। মে ১১, ২০২৬:
দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে| প্রায় প্রতিদিনই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে হাম বা এর উপসর্গ নিয়ে অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি রোগী আসছে| সেই সাথে প্রতিদিনই হাম কিংবা উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে শিশুরা| দেশে হামে প্রতিবছর কতজন আক্রান্ত হয়, তার হিসাব নিয়মিত করা হলেও মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না| দেশে হামে মৃত্যুর হার ছিল ১০ লাখে ১ শতাংশ| এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ | বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০২০ সালে দেশে হামে আক্রান্ত হয়েছিল ২ হাজার ৪১০ জন| পরের বছরগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০০-এর কম ছিল|
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের রোগের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য্ সংস্থা যখন 'উচ্চ ঝুঁকি' হিসেবে উল্লেখ করে তা এক অর্থে মহামারীই| গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে হাসপাতালগুলোতে| যে কারণে কোনো কোনো হাসপাতালে হাম রোগীদের চিকিৎসায় আলাদা ইউনিটও চালু করা হয়েছে| এ পর্যন্ত হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৪৩৫ জন| সরকারি হিসাবে গত ৫৬ দিনে মোট মৃত্যু হয়েছে ৩৫২ জনের| হাম-রুবেলার মতো রোগ প্রতিরোধে টিকার ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন নিয়মিত করা জরুরি, অথচ দেশে ২০২০ সালের পর আর কোনো ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন হয়নি| সারা বিশ্বে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে| কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত মৃত্যুহার বাড়েনি| দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আরও এক থেকে দুই মাস থাকতে পারে| কিন্তু মুশকিল হলো পরিত্রাণের পর আমরা আবার হাম মোকাবিলার কথা ভুলে যাব| এই কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই| হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া| শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অতিরিক্ত জ্বর, খেতে না পারা কিংবা তীব্র ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে|
হাম প্রতিরোধে টিকার কার্যকারিতা অনেক বেশি| সাধারণত ক্যাম্পেইন শুরুর দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রাদুর্ভাব কমতে দেখা যায়| ঠিক মতো টিকা কার্যক্রম পরিচালিত হলে প্রাদুর্ভাব থাকবে না|
হাম সাধারণত একটি ভাইরাসজনিত ও ছোঁয়াচে রোগ, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়| তবে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে| শ্বাসকষ্ট, বুক দেবে যাওয়া, খিঁচুনি, নিস্তেজভাব, বারবার বমি বা তীব্র পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| তাদের মতে, কোনো কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হলে তা দ্রুতই রোগের পুনরুত্থান ও বিস্তার ঘটাতে পারে, যা বর্তমানে দেখা পরিস্থিতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে| বর্তমানে হামের ভয়াবহ কবলে সারাদেশ| হাম, যা রুবেওলা নামেও পরিচিত, একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাল সংক্রমণ যা মূলত শ্বাসযন্ত্রকে প্রভাবিত করে| এটি আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির সময় নির্গত ফোঁটার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভাইরাসটি বাতাসে বা পৃষ্ঠতলে কয়েক ঘন্টা ধরে সক্রিয় থাকতে পারে| কেবল বাসনপত্র, পানীয় ভাগ করে নেওয়া, অথবা আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে একই ঘরে থাকার ফলে সংক্রমণ হতে পারে| রুবেওলা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট হাম, ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার চার দিন আগে থেকে চার থেকে পাঁচ দিন পরে পর্যন্ত সংক্রামক| টিকা না দেওয়া শিশুদের জন্য এই সংক্রমণ বিশেষভাবে বিপজ্জনক এবং বিশ্বের অনেক জায়গায় এটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হিসেবে রয়ে গেছে| ভাইরাসটি প্রথমে নাক এবং গলার শ্লেষ্মা ঝিল্লিকে সংক্রামিত করে এবং সাধারণত সংস্পর্শে আসার ১০ থেকে ১৪ দিন পরে লক্ষণগুলি দেখা দেয়| এটি জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং কাশির মতো সাধারণ লক্ষণগুলির সাথে শুরু হতে পারে, তারপরে হামের ফুসকুড়ি দেখা দেয় যা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে| যদিও টিকাদান বিশ্বব্যাপী হামের সংখ্যা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে, তবুও কম টিকাদানের হারযুক্ত অঞ্চলে এখনও হাম দেখা যায়| হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাল সংক্রমণগুলির মধ্যে একটি| এই ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির নাক এবং গলার মিউকাস মেমব্রেনে বাস করে এবং মূলত কাশি, হাঁচি, এমনকি অন্যদের কাছাকাছি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে| টিকা দেওয়ার পরেও অনেক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগের| কারণ ব্যাপক ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত এই রোগটি আক্রান্ত শিশুর জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে| বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে| দুই দশক আগে প্রায় নির্মূল হওয়া এই রোগটি আবারও জন¯^াস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে| রাজধানী ঢাকা ছাড়াও রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় এই রোগ ছড়িয়েছে| এর মধ্যে চলতি মাসেই মারা গেছে ৩২ শিশু| চিকিৎসকরা বলছেন, টিকা দেওয়ার পরেও অনেক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগের| কারণ ব্যাপক ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত এই রোগটি আক্রান্ত শিশুর জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে| হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে| হামের ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক| এতে এক রোগী থেকে কমপক্ষে ১৮ জন সংক্রমিত হতে পারে| টিকাদানের ঘাটতি ছাড়া অপুষ্টি, মাতৃদুধের অভাব, কৃমিনাশক ওষুধের অনুপস্থিতি এবং শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা এই প্রকোপের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে| তবে এরমধ্যে বেশি যেই সমস্যাটার কারণে হাম বেড়েছে সেটা হচ্ছে গত দুবছরে টিকা দেওয়ার পরিমাণ কমে গেছে| ইপিআই এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে হামের টিকার দেওয়ার পরিমাণ নেমে এসেছে ৫৯ শতাংশে| যা হাম বেড়ে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ| এছাড়া অনেক শিশু নির্ধারিত সময়মতো হাম-রুবেলা টিকা পাচ্ছে না| বিশেষ করে করোনার সময় ¯^াস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে| পাশাপাশি টিকা নিয়ে ভুল ধারণা, গুজব এবং সচেতনতার অভাবও একটি বড় কারণ| ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসের কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে| হামের ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক| এটি আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ছড়ায়| একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ অ-টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংক্রমিত হতে পারে| যদি টিকাদানের হার কমে যায় এবং মানুষ সচেতন না হয়, তাহলে এটি মহামারিতে রূপ নিতে পারে| তবে সময়মতো পদক্ষেপ নিলে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব| সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের ১০-১৪ দিন পর লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় এবং মুখে প্রথমে দাগ দেখা দিয়ে তা ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে| সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা| পাশাপাশি শিশুকে পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে| সচেতন থাকলেই হামের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব| শিশু বিশেষজ্ঞরা মতে, হাম প্রতিরোধযোগ্য| সময়মতো টিকা নেওয়া গেলে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব| এ সময় রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে| প্রচুর পরিমাণে পানি, ডাবের পানি, ফলের রস বা তরল জাতীয় খাবার খাওয়াতে হবে যাতে পানিশূন্যতা না হয়| ২০২০ সালের মধ্যে হাম নির্মূল সম্ভব হবেু একসময় এমন আশা করেছিল বাংলাদেশ| কিন্তু সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬ সাল করা হলেও সেই লক্ষ্য পূরণ তো দূরের কথা, বরং বাস্তবতা এখন উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে| দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামের সংক্রমণ, যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা| বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হামের এই প্রাদুর্ভাবের বিস্তার শুধু একটি সাধারণ ঘটনা নয়| এটি আমাদের দেশের সামগ্রিক ¯^াস্থ্যব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতা, নীতি-অস্থিরতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন| হামের রোগ জীবন-হুমকির জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে| এটি ছোট শিশু এবং শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক| হাম থেকে নিজেকে এবং আমাদের প্রিয়জনদের রক্ষা করার জন্য সময়মত টিকাদান সবচেয়ে কার্যকর উপায়| নিয়মিত টিকাদানের অংশ হিসেবে শিশুদের এমএমআর টিকার উভয় ডোজ গ্রহণ করা উচিত| প্রাপ্তবয়স্ক যারা কখনও টিকা নেননি বা আগে ভাইরাসের সংস্পর্শে আসেননি তাদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত| হাম প্রতিরোধ কেবল ব্যক্তিগত ¯^াস্থ্যের জন্যই নয়, জন¯^াস্থ্য রক্ষা এবং প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আগেই তা বন্ধ করার জন্যও অপরিহার্য|
হামের হঠাৎ প্রাদুর্ভাবের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে| সবচেয়ে বড় কারণ হলো শিশুর অপুষ্টি এবং নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি| সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে প্রথম ডোজের জন্য ৮৫% এবং দ্বিতীয় ডোজের জন্য ৮২% হয়েছে| সংক্রমণ রোধের জন্য সাধারণত ৯০-৯৫% টিকাদান প্রয়োজন| এই কম কাভারেজের কারণে কয়েক লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যারা এখন সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে| হঠাৎ টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ বা কম হলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়াতে পারে| বর্তমান প্রাদুর্ভাবই এর নিদর্শন| একবার সংক্রমণ বেড়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায় এবং শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়| টিকাদান কার্যক্রমের স্বাভাবিক হার বজায় রাখা ছাড়া হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়| টিকা ছাড়াও হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থার মান, পর্যাপ্ত লজিস্টিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে| শুধুমাত্র এই পদক্ষেপগুলো সমম্বয় করলে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি পুনরায় এড়ানো সম্ভব| দেশের শিশুদের জন্য হামের প্রাদুর্ভাব একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি| দ্রুত টিকাদান, মানসম্মত চিকিৎসা এবং সচেতনতার মাধ্যমে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব| প্রতিটি পরিবার ও স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক এবং দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে সংক্রমণ কমানো যায় এবং শিশুর জীবন রক্ষা করা যায়|
লেখক : কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি