আল মামুন কর্তৃক, মে ৬, ২০২৬, প্রিন্সটন, নিউজার্সী — বিজ্ঞানের ইতিহাসে কিছু নাম বাস্তবতাকে দেখার ধরনে মৌলিক পরিবর্তন আনে। আজ, ড. এম. জাহিদ হাসান নামটি কোয়ান্টাম আবিষ্কারের এক নতুন যুগের সমার্থক হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের ঢাকার শিকড় থেকে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র আঙিনা পর্যন্ত, হাসান কেবল বিশ্ব পদার্থবিজ্ঞানে অংশগ্রহণই করছেন না—তিনি এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো যখন এই ক্ষেত্রের ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন বিজ্ঞান জগতে একটিই প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে: বিশ্ব কি বাংলাদেশের পরবর্তী নোবেল বিজয়ীর অগ্রযাত্রা দেখছে?
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের 'ইউজিন হিগিন্স' অধ্যাপক ড. হাসান টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম ম্যাটার বা বস্তু নিয়ে তার অগ্রগামী পরীক্ষামূলক গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তিনি এমন কিছু অর্জন করেছেন যা বেশিরভাগ পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ কেবল স্বপ্নই দেখেন: ৮৫ বছরের পুরোনো গাণিতিক তত্ত্বকে বাস্তব রূপ দেওয়া।
২০১৫ সালে, তার দল 'ওয়েল ফার্মিয়ন' (Weyl fermion)-এর প্রথম পরীক্ষামূলক আবিষ্কারের মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করে। ১৯২৯ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করা হলেও যা আগে কখনও দেখা যায়নি, এই ভরহীন কণাটি ডিজিটাল বিশ্বে বিপ্লব ঘটাতে পারে। আমাদের বর্তমান স্মার্টফোন চালানো ইলেকট্রনগুলোর বিপরীতে, ওয়েল ফার্মিয়নগুলো 'ব্যাকস্ক্যাটারিং' (বাধা পেয়ে ফিরে আসা) ছাড়াই পদার্থের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে পারে, যার ফলে ডিভাইস গরম হয় না এবং শক্তির অপচয় রোধ হয়। এই উদ্ভাবন হাসানকে "দ্বিতীয় কোয়ান্টাম বিপ্লবের" কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে, যা কার্যত তাপহীন এবং অতি-দ্রুত ইলেকট্রনিক্সের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
বিজ্ঞানী মহলের শীর্ষে পৌঁছানোর এই যাত্রায় হাসান বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর, তিনি ২০০২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টিতে যোগ দেন।
প্রিন্সটনে তার কর্মজীবন দ্রুত সাফল্যের শিখরে পৌঁছায়। ২০১৭ সালের মধ্যে তিনি ইউজিন হিগিন্স ফিজিক্স প্রফেসর হিসেবে মনোনীত হন এবং প্রিন্সটনের 'ল্যাবরেটরি ফর টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম ম্যাটার অ্যান্ড অ্যাডভান্সড স্পেকট্রোস্কোপি'-এর হাল ধরেন। তার প্রভাব চার্লস নদীর ওপারেও বিস্তৃত, যেখানে তিনি ২০২৪ সাল থেকে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে (MIT) ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
৩০০টিরও বেশি পিয়ার-রিভিউড প্রকাশনা এবং হাজার হাজার সাইটেশনের অধিকারী ড. হাসান বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মাননা লাভ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি থেকে 'আর্নেস্ট অরল্যান্ডো লরেন্স অ্যাওয়ার্ড', আমেরিকান একাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস-এর সদস্যপদ এবং কোয়ান্টাম ফিজিক্সে উদ্ভাবনের জন্য মর্যাদাপূর্ণ 'মোস্তফা পুরস্কার'।
বিশ্বজুড়ে খ্যাতি থাকলেও ড. হাসান তার শেকড়ের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় এবং ঢাকা কলেজের প্রাক্তন এই মেধাবী ছাত্র বর্তমানে বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস (BAS)-এর একজন ফেলো হিসেবে কাজ করছেন।
একাডেমির মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করেন। বিভিন্ন একাডেমিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, তরুণ গবেষকদের মেন্টরিং এবং বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে ওকালতি করার মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করছেন যে বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক সংলাপে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর যেন জোরালো থাকে। যারা তাকে চেনেন তারা তাকে গভীর বিনয়ী একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেন—একজন "অসাধারণ পদার্থবিদ" যিনি আজও সেই শৈশবের কৌতূহল লালন করেন, যা তাকে ঢাকার কিশোর বয়সে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর তার প্রথম প্রাথমিক বই লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
বাংলাদেশে বর্তমানে একজন নোবেল বিজয়ী আছেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস (শান্তি)। যদিও এই উপমহাদেশে পদার্থবিজ্ঞানে সত্যেন্দ্রনাথ বোস (যার নামে 'বোসন' কণা) থেকে শুরু করে আবদুস সালাম পর্যন্ত এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে—তবে ড. হাসানের নোবেল জয় হবে পদার্থবিজ্ঞানে কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানীর প্রথম ঐতিহাসিক অর্জন।
এই ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই উল্লেখ করেন যে, ওয়েল ফার্মিয়ন আবিষ্কার হলো এক প্রজন্মের মধ্যে একবার ঘটা কোনো ব্রেকথ্রু—ঠিক সেই ধরনের কাজ যা রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
'ইউএস বাংলা ট্রিবিউন'-এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে ড. হাসান উল্লেখ করেন যে, তার গবেষণা গ্রুপের অনেক পিএইচডি শিক্ষার্থী বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (Caltech), হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, ইউনিভার্সিটি অফ ফ্লোরিডা, ইউসিএলএ (UCLA), ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর এবং ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটার মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন। অন্যরা লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, স্ল্যাক (SLAC) ন্যাশনাল অ্যাক্সিলারেটর ল্যাবরেটরি এবং পল শেরার ইনস্টিটিউটের মতো বিশ্বখ্যাত ল্যাবে যোগ দিয়েছেন।
ড. হাসান যখন টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর এবং কোয়ান্টাম স্টেটের রহস্য উন্মোচন করে চলেছেন, তার এই যাত্রা এক আশার আলো হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর কাছে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ঢাকার একটি ক্লাসরুম থেকে শুরু হওয়া যাত্রা মানুষের অর্জনের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে—এবং হয়তো খুব শীঘ্রই দেশের জন্য দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কার নিয়ে আসতে পারে।
সাংবাদিক আল মামুনের নোট: ড. জাহিদ হাসানের মতো একজন বিজ্ঞানীর কাজ কভার করা আমার জন্য এক বিনীত চ্যালেঞ্জ ছিল। সত্যি বলতে, আমি কোনো পদার্থবিদ নই এবং কোয়ান্টাম ম্যাটারের জটিলতাগুলো বোঝা শুরুতে বেশ কঠিন ছিল। তবে আমি অনুভব করেছি যে, আমাদের পাঠকদের জন্য এই "মহাজাগতিক" ধারণাগুলোকে সহজ বাংলায় অনুবাদ করা অত্যন্ত জরুরি। সহজ কথায়, ড. হাসানের ওয়েল ফার্মিয়ন আবিষ্কার—একটি কণা যা ৮৫ বছর ধরে গাণিতিক সমীকরণে এক 'রহস্য' হয়ে ছিল—এমন এক ভবিষ্যতের চাবিকাঠি যেখানে আমাদের ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো আর গরম হবে না বা শক্তি অপচয় করবে না। এই ভরহীন কণাগুলো কোনো বাধা ছাড়াই দ্রুত চলাচল করতে পারে তা প্রমাণ করে তিনি অতি-দ্রুত এবং তাপহীন ইলেকট্রনিক্সের দ্বার খুলে দিয়েছেন। আপনি যদি কখনো ভেবে থাকেন যে আমরা বর্তমান প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা কীভাবে অতিক্রম করব, তবে এই আবিষ্কারই হলো তার উত্তর।