স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ৮ জুন ২০২৬ ঢাকায় ডেঙ্গু ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে জাতীয় ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স কর্মসূচির প্রথম ব্যাচ শুরু করেছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ড. মিলন হলে এই কর্মসূচি উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন বছরব্যাপী জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে ৩,২১,১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল এবং ১,৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৪ সালে রোগী সংখ্যা কমে ১,০১,২১৪ জন এবং মৃত্যু ৫৭৫ জনে নেমে এসেছিল। ২০২৫ সালে ১,০২,৮৬১ জন আক্রান্ত হয়েছিল এবং ৪১৩ জন মারা গিয়েছিল। সংখ্যা হ্রাস পেলেও রোগটি এখনও উল্লেখযোগ্য।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, "ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়; এটি পুরো জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।" তিনি জানান যে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কঠিন কারণ "মশা ২০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে পারে, যেকোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে পারে।"
টিকাকরণের পরিবর্তে চিকিৎসায় ফোকাস
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি বিবেচনা করছেন বলে জানান, কিন্তু এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তিনি বলেন ব্যাপক ভ্যাকসিনেশন করতে হলে "বিপুল বাজেট প্রয়োজন হবে" এবং "চার মাস পরপর টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হলে দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি হবে।" তাই সরকার চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তবে সম্পূর্ণ প্রতিরোধ সম্ভব নয় বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মানেন। তিনি বলেন, "প্রতিরোধ ব্যবস্থা শতভাগ কার্যকর করা কঠিন। তাই আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর।"
প্লাজমা লিকেজ শনাক্তকরণ সবচেয়ে জরুরি
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, "ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্লাজমা লিকেজ সময়মতো শনাক্ত করা।" বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এফ. এম. সিদ্দিকী জানান যে প্লাজমা লিকেজ পর্যবেক্ষণ জীবন রক্ষা করে। তিনি বলেন, "প্লাজমা লিকেজ বেড়ে গেলে রোগী দ্রুত শকে চলে যেতে পারে, যা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে।"
সিদ্দিকী আরও জানান যে "নিয়মিত সিবিসি পরীক্ষা এবং প্লাজমা লিকেজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে।"
মশা প্রজনন স্থান সর্বত্র বিস্তৃত
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন দেশের শহর ও গ্রামে অসংখ্য স্থানে ডেঙ্গু বাহক এডিস মশা জন্ম নেয়। গ্যারেজে গাড়ি ধোয়ার পর জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, অব্যবহূত ক্যান, রাস্তার ছোট গর্ত এবং ড্রেন ও খালের ময়লাযুক্ত পানি সবখানেই লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যায়। তিনি ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে "টোটাল ফাইট" আখ্যা দিয়ে বলেন, "দেশের প্রতিটি নালা-নর্দমা, ডোবা, জলাবদ্ধ স্থান এবং কচুরিপানাযুক্ত এলাকা পরিষ্কার না করলে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়।"
প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পরবর্তী পর্যায়
বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনির-উজ-জামান বলেন সরকার এবার "প্রো-অ্যাকটিভ" কৌশল গ্রহণ করছে, যার মানে "সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।"
ট্রেনিং অব ট্রেইনার্সের পরবর্তী ব্যাচে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল ও কর্পোরেট হাসপাতালের চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরপর বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ অব্যাহত থাকবে। এই কর্মসূচি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি তিন মাসব্যাপী জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অংশ।