যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি সেপ্টেম্বরে বছরের হিসাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৭ শতাংশ, যা আগস্টের ১২ মাসে ছিল ৩.৪ শতাংশ—বুধবার প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে এ তথ্য জানা গেছে। বিবিসি জানায়, আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটিই মুদ্রাস্ফীতির শেষ সরকারি প্রতিবেদন।
নির্বাচনটি লড়াই হচ্ছে মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে। তাই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি এই হার অভিবাসী ও কর্মজীবী পরিবারগুলোর জন্য অর্থবহ—যাদের মাসোহারা ইতিমধ্যে চাপে পড়েছে।
কেন বাড়ল মুদ্রাস্ফীতি
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল চালিকাশক্তি পেট্রোলের দাম। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্ন হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়েছে।
সংঘাত শুরুর আগে অপরিশোধিত তেল ব্যারেলপ্রতি সামান্য ৭০ ডলারের ওপরে বিক্রি হচ্ছিল; এখন তা ১০০ ডলারের বেশি। সরবরাহ কমে গেলে চাহিদা অপরিবর্তিত থাকলেও দাম বাড়ে—পেট্রোল ও ডিজেল তৈরির কাঁচামাল অপরিশোধিত তেল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
দাম বাড়ার আরেক পথ চাহিদা। কোনো পণ্যের চাহিদা সরবরাহকে ছাড়িয়ে গেলে প্রস্তুতকারকরা দাম বাড়াতে পারে—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাবুবু পুতুলের ক্রেজ ও চড়া পুনঃবিক্রয়মূল্য তার উদাহরণ। আয় বাড়লেও চাহিদা বাড়ে, যা দামে চাপ দেয়।
ট্রাম্পের শুল্ক ও ভোক্তা মূল্য
দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের প্রায় সব বাণিজ্য অংশীদারের ওপর শুল্ক আরোপ করেন। পরে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে কিছু শুল্ক কমানো হয়। ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট বাকি বেশিরভাগ বৈশ্বিক শুল্ক বাতিল করে দিলে ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে ১০ শতাংশ নতুন বৈশ্বিক শুল্ক ঘোষণা করেন।
ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের কর আয় বাড়াবে, উৎপাদন খাতকে চাঙা করবে এবং মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পণ্য কিনতে উৎসাহ দেবে। তবে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের গবেষণা বলছে, বাড়তি আমদানি কর মুদ্রাস্ফীতিতেও প্রভাব ফেলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শুল্কের চাপে রপ্তানিকারকরা দাম প্রায় কমাননি; ফলে বাড়তি করের প্রায় ৯০ শতাংশ বহন করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। ফেডের হিসাব বলছে, গড় শুল্ক প্রতি এক শতাংশাংশ বাড়লে এক বছর পর ভোক্তা পণ্যের দাম প্রায় ০.২৫ শতাংশ বেড়েছে। বিদেশি যন্ত্রাংশ বা কাঁচামাল নির্ভর দেশীয় পণ্যের দামও পরোক্ষভাবে বেড়েছে।
সিপিআই প্রতিবেদন কীভাবে তৈরি হয়
ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিক্স ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই)-এর মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপ করে। এতে খাদ্যশস্য, পোশাক, জ্বালানি ও চিকিৎসাসেবাসহ কয়েকশ পণ্য ও সেবার দামের পরিবর্তন অনুসরণ করা হয়।
১১০ বছরের বেশি সময় ধরে এই পরিমাপ চালিয়ে আসা ব্যুরো মানুষের ব্যয়ের ধরন বদলালে পণ্যের ঝুড়িও হালনাগাদ করে। প্রথম দিকের তথ্যে গাড়ি বা রেডিও ছিল না; পরে জ্বালানি অংশে বরফের বদলে জায়গা নেয় রেফ্রিজারেশন।
লক্ষ্যের তুলনায় এখন কোথায়
ফেডারেল রিজার্ভের মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্য ২ শতাংশ—বর্তমান হার তার চেয়ে অনেক ওপরে। তবে কোভিড মহামারি ও ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণ আক্রমণের পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়ালে মুদ্রাস্ফীতি একসময় প্রায় ৯ শতাংশে পৌঁছেছিল।
মুদ্রাস্ফীতির হার কমার অর্থ দাম কমছে না; অর্থ হলো দাম ধীর গতিতে বাড়ছে। অর্থনীতির জন্য সামান্য মুদ্রাস্ফীতি ভালো বলে ধরা হয়—ফেডারেল রিজার্ভের লক্ষ্যহারই তার ইঙ্গিত দেয়।
এখন নজরে তিনটি প্রশ্ন: এই পরিসংখ্যান নভেম্বরের ভোটে কী প্রভাব ফেলবে, সুদহার নিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ কী সিদ্ধান্ত নেবে, আর পেট্রোলের দাম ও ইরান সংঘাতের গতিপথ কোন দিকে যাবে।