স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক শনিবার (২৪ অক্টোবর) স্বীকার করেছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান ইউক্রেনে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবার গতি সীমিত করেছিল। রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় ইউক্রেন এই সেবার ওপর নির্ভর করে।
বার্তা সংস্থা এপি জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাস্কের এই স্বীকারোক্তি আসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ঘোষণার পর। জেলেনস্কি জানান, স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের গতি বিধিনিষেধের আগের অবস্থায় ফিরেছে।
এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে প্রশ্ন ছিল, এই গতি কমানোর নির্দেশ কে দিয়েছিলেন। মাস্কের বক্তব্যে সে বিভ্রান্তির একটি অংশ কাটলেও আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে: একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুদ্ধরত একটি দেশের সামরিক যোগাযোগ সীমিত করতে পারে। পূর্ণ গতি ফিরেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের কথা হওয়ার পর। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলের আইনপ্রণেতারাই আনুষ্ঠানিক তদন্ত দাবি করছেন।
মাস্কের দাবি, ইউক্রেন শর্ত ভেঙেছে
এক্সে দেওয়া পোস্টে মাস্ক লেখেন, “স্টারলিংক একটি বেসামরিক বাণিজ্যিক সেবা। মানুষ হত্যার জন্য আক্রমণাত্মক ড্রোন হামলায় এটি ব্যবহারের অনুমতি কখনো ছিল না, থাকা উচিতও নয়।” তিনি আরও লেখেন, “ইউক্রেনের সেনাবাহিনী স্টারলিংকের সেবার শর্ত লঙ্ঘন করে মানুষ হত্যার জন্য আক্রমণাত্মক ড্রোন হামলায় এটি ব্যবহার করেছে। সেই ফাঁক গত সপ্তাহে বন্ধ করা হয়েছে।”
তবে এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাস্ক দাবি করেছেন যে স্টারশিল্ডে যেকোনো পরিবর্তন মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণেই হয়েছে। স্টারশিল্ড হলো স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ, যা ইউক্রেনের ড্রোন অভিযান ও যোগাযোগব্যবস্থার মূল ভিত্তি। সিএনবিসি জানায়, মাস্ক লিখেছেন, “পৃথিবীর যেকোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে স্পেসএক্স ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় অনেক বেশি করেছে।”
সিএনবিসির অনুরোধে স্পেসএক্স তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
স্টারশিল্ডের গতিসীমায় যুদ্ধক্ষেত্রে কী ঘটেছিল
সিএনবিসি জানায়, ১৪ অক্টোবর থেকে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা স্পেসএক্সের বিরুদ্ধে স্টারশিল্ডে গতিসীমা আরোপের অভিযোগ করে আসছিলেন। তাঁদের ভাষ্য, ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে চলা যেকোনো ড্রোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। এতে কিছু অভিযান ব্যাহত হয়। এপি জানায়, কমান্ডাররা ড্রোন হারানো ও অভিযান বিঘ্নিত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
শুক্রবারও এক্সে জেলেনস্কি লেখেন, বিধিনিষেধ “এখনো রয়ে গেছে” এবং “গতি ফেরেনি”। তিনি লেখেন, “পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে, আংশিকভাবে স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের নীতি ও গতিসীমার কারণে। তবে আমাদের ফ্রন্টলাইন এখনো টিকে আছে।”
শনিবার জেলেনস্কি লেখেন, “গতি এখন যেখানে থাকা দরকার, সেখানেই আছে।” তিনি জানান, রাতেই গতি ফেরা শুরু হয় এবং সকালের মধ্যে তা যথেষ্ট হয়। এতে ফ্রন্টলাইনের রসদ সরবরাহ এবং রাশিয়ার জেটচালিত শাহেদ ড্রোন প্রতিরোধের সক্ষমতা বেড়েছে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের পর্যবেক্ষণব্যবস্থা “আনুষ্ঠানিকভাবে স্টারলিংক/স্টারশিল্ডের গতি পুনরুদ্ধার রেকর্ড করছে।” মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলমান সরঞ্জামেও সংযোগ স্থিতিশীল আছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়েভহেনি খমারা বলেন, এই ফলাফল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ “আমাদের ফ্রন্টের জন্য, সেনাবাহিনী, ড্রোনের কাজ, রসদ ও যোগাযোগের জন্য।”
নির্দেশ কার, ওয়াশিংটনে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য
সিএনবিসি জানায়, মাস্ক শুরুতে এক পোস্টে দাবি করেছিলেন, এর জন্য মার্কিন সরকার দায়ী। আর ট্রাম্প বলেছিলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না।
শনিবার ফ্লোরিডায় হোয়াইট হাউসের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প মাস্ককে বিধিনিষেধ শিথিল করতে বলেছিলেন। ট্রাম্প বলেন, “আমি ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলেছি।”
এপি জানায়, ট্রাম্প বরাবর বলে আসছেন যে সিদ্ধান্তটি তিনি নেননি। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, এর জন্য মাস্ককে দোষ দেওয়া উচিত নয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মাস্কের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সমন্বয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ প্রশাসনের কোনো সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন।
সিএনবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনে সেবায় স্পেসএক্সের কথিত একতরফা পরিবর্তন নিয়ে মাস্ক ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্তের দাবি তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলের আইনপ্রণেতারা।
শান্তি আলোচনার মধ্যে কিয়েভ-ওয়াশিংটন টানাপোড়েন
এপি জানায়, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেই সেবা পুনরুদ্ধার হলো। রাশিয়া বুধবার আগামী মাসে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা আবার শুরু করতে রাজি হয়েছে। শুক্রবার মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় খেরসন অঞ্চলের রুশ-অধিকৃত শহর ওলেশকির আশপাশে স্থানীয় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ।
এপির ভাষ্য, এই ঘটনা কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন যোগ করেছে। রুশ ডিজেল আমদানি নিয়ে মস্কোর সঙ্গে ট্রাম্পের কথিত চুক্তির কারণে সম্পর্ক আগে থেকেই চাপে ছিল। ইউক্রেন ওই চুক্তিকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেছিল।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আগে থেকে সম্মত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়ার অপেক্ষায় আছে ইউক্রেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের কার্যক্রম তারা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে।