আল মামুন | নিউ জার্সি | ১৮ জুলাই, ২০২৬
কম্পিউটার লিটারেসি প্রোগ্রাম (CLP) তাদের বার্ষিক ফেস-টু-ফেস কনভেনশন ২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ‘CLP New Horizon’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, স্বেচ্ছাসেবক, দাতা এবং শুভানুধ্যায়ীরা একত্রিত হয়ে শিক্ষা, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং তরুণদের ক্ষমতায়ন নিয়ে অনুপ্রেরণামূলক এক সন্ধ্যায় অংশ নেন।
নিউ জার্সির নিউ ব্রান্সউইকে অবস্থিত রাটগার্স ইউনিভার্সিটির কলেজ অ্যাভিনিউ স্টুডেন্ট সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ কনভেনশনের মাধ্যমে CLP বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের জীবন বদলে দেওয়ার দুই দশকেরও বেশি সময়ের সফল যাত্রা উদযাপন করে।
অনুষ্ঠানে CLP-এর ২৩ বছরের অনন্য পথচলা তুলে ধরা হয়, যেখানে ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবন, স্বেচ্ছাসেবকতা ও বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টির সাফল্য উদযাপিত হয়।
শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অনুপ্রেরণায় ভরপুর এক সন্ধ্যা
১৮ জুলাই ২০২৬ (যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময়) সন্ধ্যা ৬:৩০টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য দেন মিস আফনান জেব (অডিটি)। এরপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মুহিত রহমান, যিনি শিক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন ড. ফারুক আজম এবং মিস সাবিনা রূপা। তাঁদের প্রাণবন্ত, আন্তরিক ও পেশাদার উপস্থাপনায় পুরো অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. ফারুক আজম হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, এখন অনেকেই তাঁকে ‘গত বছরের CLP-এর উপস্থাপক নাশিতা আজমের বাবা’ হিসেবেই বেশি চেনেন। তিনি বলেন, মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় নিজের পরিচয়ের চেয়ে সন্তান বা পরিবারের পরিচয়েই বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন।

তিনি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে তরুণদের প্রস্তুত করতে CLP-এর ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এক সময় কম্পিউটার শিক্ষা ছিল ভবিষ্যতের চাবিকাঠি, আর এখন AI সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য দক্ষতায় পরিণত হয়েছে।
AI-নির্ভর শিক্ষার নতুন দিগন্ত
কনভেনশনে CLP-এর চলমান বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ছিল ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, যুব উন্নয়ন কার্যক্রম, স্মার্ট ক্লাসরুম প্রকল্প এবং শিক্ষকদের সহায়তায় তৈরি AI-ভিত্তিক শিক্ষা সহকারী ‘শিক্ষা সাথী’ (Shikkha Saathi) প্ল্যাটফর্মের পরিচিতি।
বক্তারা দেখান কীভাবে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন শিক্ষকদের উন্নত পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষাসামগ্রী তৈরি, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রদানে সহায়তা করছে।
CLP নেতৃবৃন্দ বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এখন আর শুধু কম্পিউটার সাক্ষরতা কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণের সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত করাই এখন CLP-এর অন্যতম লক্ষ্য।
জাকি হোসেনকে সম্মাননা ও টেকসই উন্নয়নের পরামর্শ
অনুষ্ঠানে উদ্যোক্তা ও সমাজসেবী জাকি হোসেনকে CLP-এর শিক্ষা কার্যক্রমে তাঁর অসাধারণ অবদান এবং ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
বক্তারা সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানকে উচ্চ প্রশংসা করেন।
সম্মাননা গ্রহণের পর বক্তব্যে জাকি হোসেন CLP-এর দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থায়নের উৎস বহুমুখীকরণ, কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী শিক্ষা কার্যক্রমে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তি গড়ে তুলতে পারলে CLP ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও বৃহৎ পরিসরে কাজ করতে পারবে এবং স্বল্পমেয়াদি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সক্ষম হবে। তাঁর পরামর্শ উপস্থিত অতিথিদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।
আর্থিক প্রতিবেদন ও ২০২৬ সালের লক্ষ্য
CLP-এর কোষাধ্যক্ষ আমজাদ খান আর্থিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করে প্রতিষ্ঠানের অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, দাতাদের উদার সহযোগিতায় CLP-এর কম্পিউটার লিটারেসি সেন্টারগুলোর মাধ্যমে হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ডিজিটাল শিক্ষা লাভ করেছে।
CLP বর্তমানে স্মার্ট ক্লাসরুম, ইংলিশ ক্লাব, শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং AI-ভিত্তিক ‘শিক্ষা সাথী’ প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করছে।
আমজাদ খান বলেন, “এসব কিছুই হঠাৎ করে হয়নি, আর বিনা খরচেও হয়নি।” তিনি বলেন, CLP-এর প্রতিটি সাফল্যের পেছনে রয়েছে স্বেচ্ছাসেবক, দাতা এবং শুভানুধ্যায়ীদের নিরলস সহযোগিতা।
তিনি জানান, ২০২৬ সালে CLP-এর লক্ষ্য পূরণে ১ লাখ ৫৫ হাজার ডলার প্রয়োজন। এই অর্থ দিয়ে ১৫টি নতুন শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, ২০০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ, ৫০টি নিষ্ক্রিয় কেন্দ্র পুনরায় চালু, শিক্ষা সাথী প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ এবং প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত দাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে ৭২ হাজার ডলার অনুদান ও অঙ্গীকার সংগ্রহ করা হয়।
প্রতিষ্ঠাতার চোখে CLP-এর ভবিষ্যৎ

বিশেষ সাক্ষাৎকারে CLP-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ২০০৪ সালে নিউ জার্সিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠার পর থেকে CLP বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের আধুনিক বিশ্বের জন্য প্রস্তুত করে আসছে।
তিনি বলেন, কম্পিউটার ল্যাব, স্মার্ট ক্লাসরুম এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি CLP সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও আজীবন শিক্ষার মনোভাব গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ড. ফারুক বলেন, মানসম্মত শিক্ষার মূল ভিত্তি শিক্ষক। তাই CLP শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। পাশাপাশি তরুণদের ডিজিটাল, কারিগরি এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতের চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, শিক্ষকদের আরও দক্ষ ও কার্যকর করে তুলতে CLP একটি AI-ভিত্তিক শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে, যা পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষাসামগ্রী তৈরি, শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, মূল্যায়ন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রদানে সহায়তা করবে।
২৩ বছরে CLP-এর অর্জন
প্রতিষ্ঠার পর থেকে CLP বাংলাদেশের ৫৭টি জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করে ১ লাখ ৬৪ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীকে কম্পিউটার শিক্ষা প্রদান করেছে। এদের প্রায় অর্ধেকই নারী।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি শতাধিক কম্পিউটার লিটারেসি সেন্টার, অ্যাসোসিয়েট সেন্টার এবং স্মার্ট ক্লাসরুম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ডিজিটাল শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতিতে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
গত ২৩ বছরে CLP মৌলিক কম্পিউটার শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে স্মার্ট ক্লাসরুম, বৈশ্বিক অনলাইন শিক্ষা, দূরবর্তী স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকতা, ই-লার্নিং, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ এবং AI-ভিত্তিক শিক্ষা উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে।
স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মাননা ও অনুপ্রেরণায় সমাপ্তি
যুব স্বেচ্ছাসেবক ও আমন্ত্রিত শিল্পীদের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে কনভেনশনের সমাপনী পর্ব শুরু হয়। পরে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং স্বেচ্ছাসেবকদের অংশগ্রহণে ভেন্যু পরিষ্কারের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে, যা CLP-এর দলগত কাজ, বিনয় এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্কৃতির অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরে।

সমাপনী বক্তব্যে ড. মতাসিম বিল্লাহ ২০০৪ সালে নিউ জার্সিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের হাতে CLP প্রতিষ্ঠার ইতিহাস স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ছোট একটি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ থেকে আজ CLP বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
তিনি CLP-এর সাফল্যের কৃতিত্ব স্বেচ্ছাসেবকদের নিরলস শ্রম, দাতা ও স্পন্সরদের উদারতা, পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্ব এবং তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের নিষ্ঠার প্রতি উৎসর্গ করেন।
ড. বিল্লাহ দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাসেবী আলোকচিত্রী আহসানুল করিম (মুরাদ)-কে CLP-এর দীর্ঘ যাত্রার স্মৃতি সংরক্ষণে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য বিশেষভাবে সম্মান জানান। পাশাপাশি তিনি CLP-এর প্রধান দাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাঁদের ধারাবাহিক আর্থিক সহযোগিতাই গত ২২ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ও মানবিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
CLP Annual New Jersey Convention 2026-এর অফিশিয়াল মিডিয়া পার্টনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ইউএস বাংলা ট্রিবিউন (US Bangla Tribune)। শিক্ষা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্ষমতায়নের CLP-এর চলমান মিশন এবং অর্জনসমূহ সংবাদমাধ্যমটি বিশেষভাবে তুলে ধরে।