ইউএস বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
নিউইয়র্ক, ১৪ জুলাই ২০২৬ — কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোর দ্রুত সম্প্রসারণের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো বড় আকারের নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য। বিদ্যুৎ ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব এবং যথাযথ নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে মঙ্গলবার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঘোষিত এক বছরের এই স্থগিতাদেশ (মোরাটোরিয়াম) ৫০ মেগাওয়াট (এমডব্লিউ) বা তার বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী নতুন ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। সাধারণত এ ধরনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা সেন্টারগুলো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয়।
রাজ্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এই এক বছরের মধ্যে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য একটি সমন্বিত ও অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি এসব স্থাপনার পরিবেশ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তৃত মূল্যায়ন করা হবে।
এআই প্রযুক্তির বিস্তারে ডেটা সেন্টারের চাহিদা বেড়েছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল সেবার দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেটা সেন্টারের চাহিদা নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই ডেটা সেন্টারগুলোতে হাজার হাজার সার্ভার স্থাপন করা হয়, যা এআই মডেল, অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন, ভিডিও স্ট্রিমিং, আর্থিক লেনদেন এবং সরকারি ডিজিটাল সেবা পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
তবে একই সঙ্গে এসব স্থাপনা বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। অনেক বড় ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা একটি ছোট শহরের সমপরিমাণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে আগামী কয়েক বছরে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, যা বিদ্যমান বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কেন এই সিদ্ধান্ত নিল নিউইয়র্ক?
রাজ্য সরকার বলছে, এই সাময়িক স্থগিতাদেশের উদ্দেশ্য প্রযুক্তিগত উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং ভবিষ্যতের বড় ডেটা সেন্টারগুলো যেন পরিবেশগত ও জ্বালানি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করা।
পর্যালোচনায় যেসব বিষয় গুরুত্ব পাবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বিদ্যুৎ গ্রিডের সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা
পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর প্রভাব
কুলিং সিস্টেমে পানির ব্যবহার
স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ
স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে সম্ভাব্য অবদান
সাধারণ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিলের সম্ভাব্য প্রভাব
স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে দ্রুতগতিতে ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
তাদের প্রধান উদ্বেগগুলোর মধ্যে রয়েছে—
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা
বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ বৃদ্ধি
বিপুল পরিমাণ পানির ব্যবহার
কুলিং সিস্টেম ও ব্যাকআপ জেনারেটরের শব্দদূষণ
পরিবেশ ও ভূমি ব্যবহারে নেতিবাচক প্রভাব
পরিবেশবাদীদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ রাজ্যগুলোর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের বর্তমান চিত্র
বর্তমানে নিউইয়র্কে প্রায় ১৩০টি ডেটা সেন্টার রয়েছে।
অন্যদিকে—
ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে রয়েছে ৫০০টিরও বেশি ডেটা সেন্টার, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ডেটা সেন্টার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
টেক্সাসেও রয়েছে ৫০০টির বেশি ডেটা সেন্টার, যেখানে কম বিদ্যুৎ ব্যয়, পর্যাপ্ত জমি এবং ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।
শিল্প খাতের প্রতিক্রিয়া
প্রযুক্তি কোম্পানি ও ডেটা সেন্টার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, নতুন ডেটা সেন্টার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য অবকাঠামো গড়ে তোলে।
তাদের দাবি, আধুনিক ডেটা সেন্টারগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি জ্বালানি-দক্ষ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উন্নত কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশগত প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, নিউইয়র্কের এই সিদ্ধান্ত অন্যান্য অঙ্গরাজ্যকেও বড় আকারের ডেটা সেন্টার নির্মাণের নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
জাতীয় পর্যায়ে নতুন দৃষ্টান্ত
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নিউইয়র্কের এই এক বছরের স্থগিতাদেশ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের জন্য একটি নীতিগত দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের ফলে যখন ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ বাড়ছে, তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।