আল্ মামুন। নিউইয়র্ক: সমকালীন বাংলাদেশি শিল্পী আলমা লিয়া নিউইয়র্কের শিল্পাঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছেন। চিত্রকলা, অঙ্কন, ইনস্টলেশন ও মিশ্র মাধ্যমে নির্মিত তাঁর শিল্পকর্ম যেমন দর্শক ও শিল্পসমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি একজন কিউরেটর হিসেবেও তিনি সমানভাবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
মানবজীবনের যাত্রা, নারীর শক্তি, আত্মপরিচয়, স্মৃতি এবং মানুষের মনের অপ্রকাশিত অনুভূতিকে শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করাই তাঁর সৃষ্টির মূল উপজীব্য। চারকোল, কালি (ইঙ্ক) এবং গোল্ড লিফের ব্যবহারে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব একটি শিল্পভাষা, যা সমকালীন শিল্পচর্চায় তাঁকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রাফটে ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস (বিএফএ) সম্পন্ন করার পর ২০১৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। এরপর থেকেই তিনি নিউইয়র্কের সমকালীন শিল্পজগতে শিল্পী ও কিউরেটর—দুই ভূমিকাতেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
২০২১ সালের অক্টোবরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী “Progression through Pandemic” তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় মানুষের অবচেতন মন, মানসিক পরিবর্তন, সৃজনশীলতার বিকাশ এবং প্রতিকূল সময়ে আত্ম-আবিষ্কারের গল্প তুলে ধরা এই প্রদর্শনী শিল্পসমালোচকদের উচ্চ প্রশংসা অর্জন করে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশেষভাবে স্থান পায়।
এরপর বাংলাদেশ, ভুটান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস, ওহাইও ও জর্জিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত অসংখ্য দলীয় শিল্প প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে তিনি নিজের শিল্পীসত্তার বহুমাত্রিকতা তুলে ধরেছেন। প্রতিটি প্রদর্শনীর মূল ভাবনার সঙ্গে নিজের শিল্পধারাকে সফলভাবে সমন্বয় করার দক্ষতার জন্য তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত।
শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, একজন সফল কিউরেটর হিসেবেও আলমা লেয়া ব্যাপক পরিচিত। তাঁর কিউরেশনে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত “Memoir” প্রদর্শনীতে ৩৫ জন বাঙালি শিল্পীর অংশগ্রহণ ছিল, যা শহরটির অন্যতম বৃহৎ বাংলা শিল্প প্রদর্শনী হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রদর্শনীটির সফল আয়োজনের জন্য জামাইকা সেন্টার ফর আর্টস অ্যান্ড লার্নিং (JCAL)-এর কর্তৃপক্ষ, শিল্পসমালোচক এবং শিল্পমহলের অনেকেই তাঁর নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ডে বাংলাদেশি লোকজ ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে নির্মিত তাঁর দুটি পাবলিক আর্ট স্থায়ীভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে। এসব শিল্পকর্ম বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির পাশাপাশি অন্যান্য সম্প্রদায়ের দর্শকদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে।
আলমা লেয়া নিউইয়র্ক ফাউন্ডেশন ফর দ্য আর্টস (NYFA)-এর নিবন্ধিত শিল্পী। শিল্পচর্চায় অবদানের জন্য তিনি একাধিক স্কলারশিপ ও অনুদান লাভ করেছেন। ২০২৫ সালে তিনি জেএফকে টার্মিনাল–৬ কমিউনিটি আর্ট প্রোগ্রামের বিচারক হিসেবেও স্বেচ্ছাসেবী দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে তিনি জামাইকা সেন্টার ফর আর্টস অ্যান্ড লার্নিং-এর Visual Voice Program-এর কিউরেটর হিসেবে কর্মরত। তাঁর কিউরেট করা উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনীগুলোর মধ্যে রয়েছে “Phenomenology: Dream vs. Reality”, “Emancipation: The Rise of Womanhood”, এবং ২০২৬ সালের “Culture through Kaleidoscope”। বিশেষ করে নারী শিল্পীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং তাদের শিল্পভাবনা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা শিল্পাঙ্গনে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
শিল্প ও সমাজে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৫ সালে আলমা লেয়া “Diva Award – Celebrating a Career of Art and Impact” অর্জন করেন। এই সম্মাননা তাঁর শিল্পচর্চার পাশাপাশি সমাজে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সম্প্রতি তিনি গভর্নরস আইল্যান্ডে “Between River and Harbour: Stories That Carry Us” শীর্ষক একক আর্ট রেসিডেন্সি সম্পন্ন করেছেন। লাইভ পেইন্টিং ও ইনস্টলেশনভিত্তিক এই প্রকল্পে অভিবাসন, স্মৃতি, পরিচয় এবং মানবিক সম্পর্কের গভীর গল্প তুলে ধরা হয়। তাঁর এই কাজ লোয়ার ম্যানহাটনের আর্ট কালচার কাউন্সিল এবং নিউইয়র্কের শিল্পসমালোচকদের বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেছে।
বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আলমা লিয়া আজ এক অনুপ্রেরণার নাম। শিল্পী ও কিউরেটর—উভয় পরিচয়ে তিনি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন এবং সমকালীন শিল্পচর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন।