ড. এম. মোতাসিম বিল্লাহর জীবনকাহিনি শিক্ষা, অধ্যবসায় এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার এক অনন্য উদাহরণ। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত উপকূলীয় জনপদ চরফ্যাশন থেকে উঠে এসে তিনি বিশ্বখ্যাত বায়োমেডিকেল বিজ্ঞানী ও ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা নেতায় পরিণত হন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, দৃঢ় সংকল্প ও শিক্ষার শক্তি যেকোনো সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারে।
ভোলা দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরঘেঁষা চরফ্যাশনে জন্ম ও বেড়ে ওঠা ড. বিল্লাহ এমন এক সময়ে বড় হয়েছেন, যখন ওই অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে এক লক্ষাধিক মানুষের জন্য সেখানে ছিল মাত্র একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং একটি মাদ্রাসা। সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী ছেলেদের পারিবারিক কৃষিকাজ বা ব্যবসায় যুক্ত হওয়া এবং মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়াই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ড. বিল্লাহর বাবা-মা একটি সাহসী ও ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যা তাঁদের পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। গভীর ধর্মীয় ও বিদ্বৎসমাজের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত পরিবার হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা তাঁদের পাঁচ ছেলের জন্য বেছে নেন আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা। উন্নত শিক্ষার জন্য সন্তানদের বাড়ি থেকে দূরে পাঠানো হয় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও বরিশাল জেলা স্কুলের মতো অঞ্চলের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে।
শিক্ষার প্রতি তাঁদের এই দূরদর্শী বিনিয়োগ অসাধারণ ফল বয়ে আনে। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনজন ইংল্যান্ড, কানাডা ও জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং অন্য দুইজন চিকিৎসক হন। সন্তানদের এই অসামান্য সাফল্যের জন্য তাঁদের মা স্থানীয়ভাবে “রত্নগর্ভা মা” হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
শৈশব থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ড. বিল্লাহ চরফ্যাশন ও বরিশালে কৃতিত্বের সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি বায়োকেমিস্ট্রিতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন এবং পরে একই বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
শুধু গবেষণাগারেই নয়, বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ছিল তাঁর আগ্রহ। শিক্ষকতা জীবনের শুরুতে তিনি বিজ্ঞানভিত্তিক দুটি নাটক রচনা করেন, যা বিজ্ঞান যোগাযোগের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ।
১৯৭৪ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ ব্রিটিশ কমনওয়েলথ স্কলারশিপ লাভ করে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণার জন্য যান। ১৯৭৭ সালে বায়োকেমিস্ট্রিতে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর তিনি একই গবেষণাগারে আরও এক বছর গবেষণা ফেলো হিসেবে কাজ করেন।
পরবর্তীতে তাঁর বৈজ্ঞানিক যাত্রা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে যায়, যেখানে তিনি নর্থ ক্যারোলিনার রিসার্চ ট্রায়াঙ্গল পার্কে বারোজ ওয়েলকাম অ্যান্ড কোম্পানিতে পোস্টডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন। সেখানেই তিনি ট্রান্সলেশনাল রিসার্চ বা মৌলিক গবেষণাকে রোগীর জন্য কার্যকর চিকিৎসায় রূপান্তরের গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।
১৯৮৩ সালে তিনি শেরিং-প্লাউ করপোরেশনে যোগ দেন এবং শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ও গৌরবময় ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা জীবন। কোষীয় সংকেত প্রেরণ, প্রদাহ ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর অগ্রগামী গবেষণা তাঁকে দ্রুত প্রতিষ্ঠানের অন্যতম শীর্ষ বিজ্ঞানীতে পরিণত করে।
গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি তিনবার “প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং রিসার্চ” লাভ করেন, যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ড। পরবর্তীতে তিনি সিনিয়র ডিস্টিংগুইশড রিসার্চ ফেলো ও সিনিয়র ডিরেক্টর পদে উন্নীত হন এবং বিভিন্ন বহুমাত্রিক গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেন।
তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণা কর্মসূচি থেকে অ্যালার্জি, হাঁপানি এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি)-এর জন্য একাধিক সম্ভাবনাময় ওষুধের উন্নয়ন সম্ভব হয়। তাঁর কাজের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখযোগ্য ওষুধগুলোর মধ্যে রয়েছে বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টি-অ্যালার্জি ওষুধ ক্লারিনেক্স এবং অ্যালার্জিজনিত নাকের প্রদাহের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ন্যাসোনেক্স।
২০০৪ সালে সফল মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারের পর ড. বিল্লাহ তাঁর পেশাজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন। ২০০৮ সালে তিনি ব্রিস্টল মায়ার্স স্কুইবে যোগ দেন এবং বৈশ্বিক ওষুধ অনুমোদন প্রক্রিয়ার জন্য জটিল বৈজ্ঞানিক ও ক্লিনিক্যাল তথ্যকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উপযোগী নথিতে রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী ১৬ বছরে তিনি ক্যানসার চিকিৎসার জন্য অপডিভো, রক্ত জমাট প্রতিরোধে এলিকুইস এবং অটোইমিউন রোগের চিকিৎসায় ওরেনসিয়াসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ওষুধের উন্নয়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০২৪ সালে তিনি ৪৫ বছরের এক অসাধারণ পেশাজীবনের ইতি টেনে অবসরে যান।
গবেষণাজীবনে ড. বিল্লাহ কোষীয় যোগাযোগ, লিপিড বায়োকেমিস্ট্রি এবং প্রদাহজনিত সংকেত প্রক্রিয়া নিয়ে মৌলিক অবদান রাখেন। তাঁর গবেষণা ব্যাখ্যা করেছে কীভাবে কোষঝিল্লি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন অণু কোষের ভেতরে ও কোষের মধ্যে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রদাহ ও ব্যথার প্রক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাঁর গবেষণা অ্যাজমা, সিওপিডি, আর্থ্রাইটিসসহ দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগের চিকিৎসার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
তাঁর কর্মজীবনে তিনি ১০০টিরও বেশি পিয়ার-রিভিউড গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন এবং অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। তাঁর গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে। তিনি এক দশক ধরে খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিক জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি আমেরিকান সোসাইটি ফর বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজির সদস্য এমেরিটাস হিসেবে সম্মানিত।
বর্তমানে ড. বিল্লাহ তাঁর স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অবসর জীবন উপভোগ করছেন। তবে তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়নে তাঁর কাজ বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত চরফ্যাশনের মাটি থেকে উঠে এসে বিশ্বের শীর্ষ ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছানোর এই যাত্রা শিক্ষা, অধ্যবসায় এবং স্বপ্নপূরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ড. এম. মোতাসিম বিল্লাহর জীবনগাঁথা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক অমূল্য উৎস হয়ে থাকবে।