আল মামুন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে — হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে আবারও নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (সিনিয়র সহকারী সচিব) নওশাদ খান যাত্রীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছেন।
বিমানবন্দরে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে অতীতে তাঁর নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের জন্য পরিচিত নওশাদ খান এবারও যাত্রীদের দুর্ভোগ হ্রাস, সেবাসংক্রান্ত অভিযোগের সমাধান এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর পুনরায় সক্রিয় ভূমিকা পালনের ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার দিয়ে যাতায়াত আরও সহজ ও স্বস্তিদায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইউএস বাংলা ট্রিবিউনকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নওশাদ খান বলেন, বিমানবন্দরের সেবার মান উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তির সাফল্য নয়; বরং এটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং কার্যকর নেতৃত্বের ফল।
কথোপকথনে তিনি বলেন, “এটি শুধু আমার সাফল্য নয়। এটি পুরো দলের সাফল্য।” এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সহকর্মীদের অবদান এবং তাঁদের কাজের পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
যাত্রীসেবায় ২৪ ঘণ্টা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যক্রম
যাত্রীদের অধিকার সুরক্ষা এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জবাবদিহি বাড়ানোর লক্ষ্যে চারজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা যাত্রীদের সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিমানবন্দরে কোনো যাত্রীর আইনগত অধিকার লঙ্ঘিত হলে কিংবা তিনি হয়রানির শিকার হলে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন। এ জন্য টার্মিনাল-১-এর ১ নম্বর গেটের কাছে অবস্থিত বিমানবন্দর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যোগাযোগ করা যাবে।
এ ছাড়া ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ অথবা ই-মেইলের মাধ্যমেও অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে।
মোবাইল/হোয়াটসঅ্যাপ: +880 1304-050603
ই-মেইল: airport.magistrate.bd@gmail.com
বিমানবন্দরে হয়রানি, যাত্রী অধিকার লঙ্ঘন কিংবা সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন এমন কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে যাত্রীরা যাতে সহজে সহায়তা পেতে পারেন, সে লক্ষ্যেই এসব যোগাযোগমাধ্যম চালু রাখা হয়েছে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দল যাত্রীদের অধিকার সুরক্ষা, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং যথাযথ সেবা নিশ্চিত করতে সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এসব যোগাযোগমাধ্যম কার্যকর রাখা এবং অভিযোগের দ্রুত সাড়া নিশ্চিত করা যাত্রীদের আস্থা বাড়াতে ও বিমানবন্দরে নিরাপদ এবং জবাবদিহিমূলক পরিবেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সেবার মানোন্নয়নে দলগত প্রচেষ্টা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা
টেলিফোনে আলাপকালে নওশাদ খান নিজের ব্যক্তিগত ভূমিকার পরিবর্তে বিমানবন্দরের পুরো দলের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, যাত্রীদের অভিযোগের সমাধান এবং সেবার মান উন্নয়নে অর্থবহ পরিবর্তন আনতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জনে সমন্বয়, যৌথ দায়িত্ববোধ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা অপরিহার্য।
তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সেবার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নওশাদ খানের বক্তব্যে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার জটিল বাস্তবতাও উঠে এসেছে। কারণ, যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা, পরিচালনায় নিয়োজিত দল এবং আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
যাত্রীদের কাছে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দৈনন্দিন সেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তনের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত লাগেজ ট্রলি, দ্রুত ও কার্যকর ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, ন্যায্য আচরণ এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি।
বিমানবন্দরের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা
নওশাদ খান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদের নেতৃত্ব, দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতার প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, বিমানবন্দরে বিভিন্ন পরিবর্তন বাস্তবায়নে নির্বাহী পরিচালকের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
নওশাদ খান বলেন, নির্বাহী পরিচালকের সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাঁর সমর্থন ছাড়া বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা কঠিন হতো বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই বক্তব্য বিমানবন্দরের সেবার মানোন্নয়নে কার্যকর নেতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে। দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো মোকাবিলা এবং যাত্রীদের জন্য বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে সমন্বয়, সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
যাত্রীসেবার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করলেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক
ইউএস বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে পৃথক এক কথোপকথনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদ দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারটির যাত্রীসেবায় বিদ্যমান বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিমানবন্দরের বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে যাত্রী ব্যবস্থাপনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ক্রমবর্ধমান যাত্রীসংখ্যা এবং তাঁদের সেবার চাহিদা সামাল দিতে বর্তমান সুযোগ-সুবিধা হিমশিম খাচ্ছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।
তবে এসব সমস্যা সমাধান এবং যাত্রীদের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা উন্নত করতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, তৃতীয় টার্মিনাল (টার্মিনাল-৩) পুরোপুরি চালু হলে অবকাঠামোগত অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
নির্বাহী পরিচালকের বক্তব্যে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জের ব্যাপকতা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি অবকাঠামো উন্নয়ন, কার্যকর সমন্বয় এবং যাত্রীসেবার মান বাড়াতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টার গুরুত্বও স্পষ্ট হয়েছে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে বিদ্যমান চাপের কিছুটা প্রশমন হবে বলে আশা করা হলেও দৈনন্দিন কার্যক্রম এবং যাত্রীদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের দিকে নজর দেওয়া অব্যাহত রাখা জরুরি।
ট্রলি ও ব্যাগেজ সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ
সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পোস্টে নওশাদ খান যাত্রীসেবা উন্নয়ন এবং ভোগান্তি কমাতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। বিমানবন্দরের পুরো দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, লাগেজ ট্রলি এবং ব্যাগেজ সেবার সমস্যা সমাধানে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
বিমানবন্দরে যাত্রীদের আগমন ও প্রস্থানের অভিজ্ঞতায় ট্রলির প্রাপ্যতা এবং ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে ভ্রমণকারী পরিবার, বয়স্ক যাত্রী এবং একাধিক লাগেজ বহনকারী ব্যক্তিদের জন্য এসব সেবা অত্যন্ত জরুরি।
যাত্রীরা যাতে প্রয়োজনের সময় এসব মৌলিক সেবা পান এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করতে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
যাত্রী অধিকার সুরক্ষায় নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত
যাত্রীদের অধিকার রক্ষা এবং অনিয়ম প্রতিরোধে নজরদারি কার্যক্রম ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়টিও তুলে ধরেন নওশাদ খান।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, কার্যকর নজরদারি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অনিয়ম প্রতিরোধ ও জবাবদিহি বাড়ানো সম্ভব হবে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সমন্বয়, যথাযথ তদারকি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ বিমানবন্দরে আরও সুশৃঙ্খল ও ন্যায্য পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
আগের অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখার প্রত্যাশা
নওশাদ খান ও তাঁর দলের নতুন করে সক্রিয় হওয়ার মধ্য দিয়ে যাত্রীকেন্দ্রিক বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা আবারও গুরুত্ব পেয়েছে। বিমানবন্দরে তাঁর আগের কার্যক্রম ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছিল। এবার সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আরও অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে নওশাদ খান যেমনটি উল্লেখ করেছেন, টেকসই অগ্রগতি কেবল একজন ব্যক্তির উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক সহযোগিতা, বিমানবন্দরের কার্যকর নেতৃত্ব এবং দৈনন্দিন পরিচালনা ও যাত্রীসেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত অঙ্গীকার প্রয়োজন।
তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন, উন্নত দেশগুলোতে প্রচলিত কিছু যাত্রীসেবা বাংলাদেশেও শিগগির চালু করা সম্ভব হবে। তাঁর এই প্রত্যাশা বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি যাত্রী-অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে।
প্রকৃত পরীক্ষা: যাত্রীদের অভিজ্ঞতার উন্নয়ন
যাত্রীদের কাছে এসব উদ্যোগের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে। সহজে লাগেজ ট্রলি পাওয়া, আরও কার্যকর ব্যাগেজ সেবা, শক্তিশালী নজরদারি, যাত্রীদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ এবং সমস্যার দ্রুত সমাধান—এসবই হবে সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।
নওশাদ খান ও বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট দলের নতুন উদ্যোগ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা এবং বিমানবন্দরের নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমন্বিতভাবে মোকাবিলার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে স্বীকার করলেও টার্মিনাল-৩ চালুর প্রত্যাশা নতুন সক্ষমতা সৃষ্টি এবং যাত্রী ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার আশা জাগাচ্ছে। তবে এরই মধ্যে বিদ্যমান সেবাসংক্রান্ত সমস্যাগুলোর প্রতি ধারাবাহিক মনোযোগ দেওয়া যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবার অগ্রগতি নিয়ে ইউএস বাংলা ট্রিবিউন নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ অব্যাহত রাখবে। চলমান উদ্যোগগুলো যাত্রীদের জন্য দৃশ্যমান, পরিমাপযোগ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন বয়ে আনতে পারছে কি না, সেদিকেই থাকবে বিশেষ নজর।