আমেরিকা থেকে আল্ মামুন, মে ২০, ২০২৬: একটি শিশু। বয়স মাত্র ৮ বছর। স্থানীয় পপুলার স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। যে বয়সে তার হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন পেন্সিল আর রূপকথার বই, সেই বয়সে তার নিথর, খণ্ডিত দেহ উদ্ধার হলো প্রতিবেশীর শৌচাগারের বালতি আর খাটের নিচ থেকে। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ঘটে যাওয়া এই লোমহর্ষক ও নৃশংস ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় বিচার কাঠামোর ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দিয়েছে।
ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যখন শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বুক ফেটে কাঁদছিলেন, তখন তার মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি শব্দ ছিল এই রাষ্ট্রের বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক তীব্র চপেটাঘাত। ৫৫ বছর বয়সী এক প্রবীণ বাবা যখন শত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেন—"আমি কোনো বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না!"—তখন বুঝতে হবে, এ দেশের সাধারণ মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে ১৯ মে ২০২৬, মঙ্গলবার সকালে, রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ৭ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির একটি পাঁচতলা ভবনের তিনতলায়।
ভুক্তভোগী শিশু রামিসা আক্তারের পরিবার গত ১৭ বছর ধরে ওই ভবনের তিনতলার উত্তর পাশের ফ্ল্যাটে বসবাস করে আসছে। রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন এবং মা পারভীন আক্তার একজন গৃহিণী। দুই বোনের মধ্যে রামিসা ছিল ছোট।
সকাল ১০:৩০ মিনিট, প্রতিদিনের মতো রামিসার মা পারভীন আক্তার তাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য তৈরি হচ্ছিলেন এবং খুঁজছিলেন। পুরো পাঁচতলা ভবন খুঁজেও যখন রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন হঠাৎ তার মায়ের চোখ পড়ে তাদের ঠিক উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের (দক্ষিণ পাশের ফ্ল্যাট) দরজার সামনে। সেখানে পড়ে ছিল রামিসার এক পাটি স্যান্ডেল। স্যান্ডেল দেখে মায়ের মনে সন্দেহ জাগে। তিনি দরজায় ধাক্কাধাক্কি এবং চিৎকার শুরু করেন। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। তখনো মা জানতেন না, তিনি যখন দরজায় কড়া নাড়ছেন, ঠিক তখনই দরজার ওপাশে তার কলিজার টুকরোকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছিল।
পরবর্তীতে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই স্তব্ধ হয়ে যায়। ভেতর থেকে রামিসার খণ্ডিত দেহ উদ্ধার করা হয়। ঘাতকরা তার ঘাড় থেকে মাথা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। বিচ্ছিন্ন মাথাটি পাওয়া যায় শৌচাগারের একটি বালতির ভেতর, আর শরীরের বাকি অংশটি লুকিয়ে রাখা হয়েছিল খাটের নিচে। পুলিশের ধারণা, অপরাধ গোপন ও মরদেহ পুরোপুরি গুম করার উদ্দেশ্যে তারা লাশটি টুকরো টুকরো করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু রামিসার মায়ের অতর্কিত উপস্থিতির কারণে তা সফল হয়নি।
পুলিশ ঘটনার মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মূল ঘাতক ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে বিকৃত মানসিকতার এক দম্পতি, যারা মাত্র দুই মাস আগে ওই ফ্ল্যাটে ভাড়াটে হিসেবে উঠেছিল।
এই হত্যাকান্ডের মূল আসামি মো. জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা (৩৪)। জাকির হোসেন পেশায় একজন রিকশা মেকানিক। তার ও তার স্ত্রীর মূল বাড়ি নওগাঁর সিংড়ায়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, জাকির একজন চরম বিকৃত যৌনরুচি সম্পন্ন মানুষ। তার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, প্রতিবেশী এই নিষ্পাপ শিশুটি জাকিরের বিকৃত যৌন লালসার শিকার হয়েছিল। নির্যাতন বা রক্তক্ষরণের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়ে সে রামিসাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর আলামত লোপাটের জন্য দা দিয়ে কেটে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ঘটনার পর সে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লায় চলে যায়। সেখান থেকে বিকাশের দোকান দিয়ে টাকা তোলার সময় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
এই হত্যাকান্ডের সহযোগী আসামি (স্ত্রী) স্বপ্না আক্তার (২৬)। স্বপ্না আক্তার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সমান অংশীদার ও সহযোগী। রামিসার মা যখন বাইরে থেকে অনবরত দরজা ধাক্কাচ্ছিলেন, তখন স্বপ্না ভেতর থেকে দরজা খোলেননি। তিনি ইচ্ছা করেই দীর্ঘক্ষণ দরজা বন্ধ রাখেন যাতে তার ঘাতক স্বামী জাকির হোসেন জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায়। স্বামী পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল সে দরজা খোলে। পুলিশ তাকে ঘটনাস্থল (ফ্ল্যাট) থেকেই আটক করে।
একজন বাবার জবানবন্দি: বিচার ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক
এই ঘটনার পর গণমাধ্যমের সামনে রামিসার বাবার যে আর্তনাদ, তা কেবল শোকাতুর বাবার কান্না ছিল না, তা ছিল এক নির্মম বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ ৫৫ বছরের জীবন অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যা বলেছেন, তা এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা বিচারহীনতার সত্যকে উন্মোচন করে। বিচারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, তিনি কোনো আইনি বিচার চান না। কারণ তিনি জানেন এই প্রশাসন বা রাষ্ট্র বিচার করতে পারবে না। অতীতে এমন হাজারো ঘটনার কোনো দৃষ্টান্তমূলক রেকর্ড এ দেশে নেই।
উপস্থিত লোকজন ও প্রতিবেশীরা যখন তাকে আইনি লড়াইয়ের সান্ত্বনা দিচ্ছিল, তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, "আপনারা আমার দুঃখ কী বুঝবেন? আপনারা আমার সাথে কিসের ডায়লগ মারেন?" তিনি প্রশ্ন তোলেন, কারও কাছে কি গ্যারান্টি আছে যে সত্যি বিচার হবে?
তিনি আমাদের গণমাধ্যম এবং জনসচেতনতার ট্রেন্ডকে কটাক্ষ করে বলেন, এই ঘটনাটি বড়জোর ১৫ দিন আলোচনায় থাকবে। এরপর দেশে অন্য কোনো বড় ইস্যু বা ঘটনা ঘটলে মানুষ রামিসাকে ভুলে যাবে এবং ফাইল ধুলোবালির নিচে চাপা পড়ে যাবে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলছিলেন, এই ৮ বছরের মাসুম বাচ্চাটা তাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না। দিনে ৫০ থেকে ১০০ বার কল দিত, বাবা বাড়ি ফেরার আগে ফ্রিজে শরবত বানিয়ে রাখত। আটটি বছর যে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়েছেন, আজ থেকে সেই শূন্য বিছানায় তিনি কাকে নিয়ে ঘুমাবেন? অপরাধ যদি তার নিজেরও হয়ে থাকে, তবে রাষ্ট্র যেন তাকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়, বিনিময়ে যেন তার সন্তানকে ফিরিয়ে দেয়।
প্রতিবেদকের শেষ কথা: নতুন প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা আহ্বান
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি যখন একটি নতুন বাংলাদেশের হাল ধরেছেন, তখন মিরপুরের এই তিনতলার ফ্ল্যাটের মেঝেতে লেপ্টে থাকা ৮ বছরের রামিসার রক্ত আমাদের এক প্রাচীন অন্ধকার বিচারহীনতার গল্প মনে করিয়ে দিচ্ছে।
আপনিও বাবা, আপনারও একটি মেয়ে আছে। একজন বাবা যখন প্রকাশ্য ক্যামেরার সামনে রাষ্ট্রের বিচার ক্ষমতার ওপর থুতু ফেলে বলেন "আপনারা বিচার করতে পারবেন না"—তখন বুঝতে হবে আইন ও প্রশাসনের ওপর সাধারণ মানুষের বিশ্বাস শূন্যের কোঠায়। রামিসার বাবা যে ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, যে "ধামাচাপা পড়ার" আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন—সেটিকে ভুল প্রমাণিত করার দায়িত্ব এখন আপনার সরকারের।
রিকশা মেকানিক জাকির হোসেন এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মতো বিকৃত খুনিদের এমন এক দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যা দেখে এই দেশের আর কোনো অপরাধী যেন কোনো শিশুর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস না পায়। রামিসা আর ফিরবে না, কিন্তু তার বাবার সেই অবাধ্য ক্ষোভ যেন এই নতুন বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কারণ হয়।