ব্রেকিং নিউজ
স্বাস্থ্য

বাংলাদেশে রোগী নিরাপত্তা জোরদার: আইসিইউ সংক্রমণ ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) সংকট মোকাবিলা

বাংলাদেশে রোগী নিরাপত্তা জোরদার: আইসিইউ সংক্রমণ ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) সংকট মোকাবিলা
বাংলাদেশে রোগী নিরাপত্তা জোরদার: আইসিইউ সংক্রমণ ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) সংকট মোকাবিলা

গত এক দশকে বাংলাদেশে আধুনিক হাসপাতাল, উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (ICU)-এর দ্রুত বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি বড় হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলেটর, জটিল অস্ত্রোপচার, ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম এবং বিশেষায়িত ক্রিটিক্যাল কেয়ার সেবা চালু হয়েছে।

বাহ্যিকভাবে স্বাস্থ্যখাতের এই অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক মনে হলেও, এর আড়ালে একটি গুরুতর ও ক্রমবর্ধমান সংকট লুকিয়ে রয়েছে—রোগী নিরাপত্তা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতা এখনো অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে, আইসিইউ—যা মানুষের জীবন বাঁচানোর শেষ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা—ধীরে ধীরে রোগী নিরাপত্তার নীরব হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।

হাসপাতাল-সংক্রমিত ইনফেকশন বা Hospital-Acquired Infections (HAIs) বর্তমানে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আইসিইউতে ভর্তি রোগীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকেন, কারণ তাদের প্রায়ই ভেন্টিলেটর, ক্যাথেটার, ইনভেসিভ পদ্ধতি এবং দীর্ঘমেয়াদি হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন হয়। এসব চিকিৎসা জীবন রক্ষাকারী হলেও, যথাযথ সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকলে এগুলোই মারাত্মক সংক্রমণের উৎসে পরিণত হতে পারে।

ভেন্টিলেটর-অ্যাসোসিয়েটেড নিউমোনিয়া (VAP), ক্যাথেটার-সম্পর্কিত রক্ত সংক্রমণ, মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং সেপসিস এখন অনেক হাসপাতালে ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে। গুরুতর ক্ষেত্রে এসব সংক্রমণ সেপটিক শক, অঙ্গ বিকল হওয়া এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো—অনেক রোগী এখন শুধু তাদের মূল রোগে মারা যাচ্ছেন না; তারা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সেখানকার সংক্রমণে মৃত্যুবরণ করছেন।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে Multi-Drug-Resistant Organisms (MDROs)-এর দ্রুত বিস্তারের কারণে। Acinetobacter baumannii, Klebsiella pneumoniae এবং Pseudomonas aeruginosa-এর মতো ব্যাকটেরিয়া এখন বহু শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। ফলে চিকিৎসা আরও জটিল, ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ইতোমধ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)-কে একটি “নীরব মহামারি” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ প্রতিরোধী সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছেন। কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে অনেক দেশে আইসিইউভিত্তিক প্রতিরোধী সংক্রমণ আরও বেড়েছে।

Global Research on Antimicrobial Resistance (GRAM) Project-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য সরাসরি AMR দায়ী ছিল। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষ AMR-সম্পর্কিত কারণে মৃত্যুবরণ করতে পারেন।

দক্ষিণ এশিয়া—বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান—AMR-এর জন্য বিশ্বের অন্যতম উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষত আইসিইউগুলোতে বহুঔষধ-প্রতিরোধী সংক্রমণের হার অত্যন্ত বেশি। কিছু গবেষণায় Acinetobacter প্রজাতির মধ্যে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার কার্বাপেনেম প্রতিরোধ এবং ভেন্টিলেটর-সম্পর্কিত নিউমোনিয়া ও সেপসিসের বাড়তি প্রবণতা দেখা গেছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে HAIs-এর হার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। সাম্প্রতিক এক মেটা-অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, সার্বিকভাবে HAIs-এর প্রাদুর্ভাব প্রায় ২২ শতাংশ, যেখানে WHO দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে এই হার ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। কিছু স্বল্প-সুবিধাসম্পন্ন পরিবেশে প্রতি তিনজন আইসিইউ রোগীর একজন হাসপাতালে-সম্পর্কিত সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারেন।

বাংলাদেশে এই সংকটের পেছনে একাধিক আন্তঃসম্পর্কিত কারণ কাজ করছে।

অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। অনেক মানুষ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনছেন, আবার কেউ কেউ পূর্ণ কোর্স শেষ করার আগেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। সাধারণ সর্দি-কাশি বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ভাইরাসজনিত রোগেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি গুরুতর AMR সংকটের মুখোমুখি। গবেষণা অনুযায়ী, শুধু ২০১৯ সালেই বাংলাদেশে প্রায় ২৬ হাজার মৃত্যু অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ঢাকার সাম্প্রতিক হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউ-সম্পর্কিত প্রায় ৭৫ শতাংশ ব্যাকটেরিয়াল আইসোলেট ছিল বহুঔষধ-প্রতিরোধী (MDR), এবং কিছু জীবাণু কোলিস্টিন ছাড়া প্রায় সব অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।

এই “ওভার-দ্য-কাউন্টার অ্যান্টিবায়োটিক সংস্কৃতি” ব্যাকটেরিয়াগুলোকে আরও শক্তিশালী ও প্রতিরোধী করে তুলছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে জরিপকৃত ৯০ শতাংশেরও বেশি কমিউনিটি ফার্মেসি প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করে। এছাড়া ধারণা করা হয়, প্রায় দেড় কোটি মানুষ প্রতিদিন যথাযথ চিকিৎসা তত্ত্বাবধান ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করছেন।

অন্যদিকে, অনেক হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনো দুর্বল। হাত পরিষ্কারের নিম্নমানের অভ্যাস, অতিরিক্ত রোগীর চাপ, সীমিত আইসিইউ জনবল, অপর্যাপ্ত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ প্রশিক্ষণ এবং দুর্বল ল্যাবরেটরি নজরদারি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে।

পশুপালন, পোলট্রি, মৎস্য এবং কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে পরিচালিত একটি জাতীয় গবেষণায় পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ১২.৫ শতাংশে Carbapenem-resistant Enterobacterales (CRE) শনাক্ত হয়েছে, যার সর্বোচ্চ হার দেখা গেছে নবজাতক ও বয়স্ক রোগীদের মধ্যে। কার্বাপেনেমকে গুরুতর সংক্রমণের “শেষ সারির অ্যান্টিবায়োটিক” হিসেবে ধরা হয়, ফলে এই প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া এখন খাদ্যব্যবস্থা, পরিবেশ, হাসপাতাল এবং সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি আর শুধু চিকিৎসাবিষয়ক সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, মানব নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।

বিশ্ব ধীরে ধীরে এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা “Post-Antibiotic Era” বলে আখ্যায়িত করছেন—একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে সাধারণ সংক্রমণ, ছোটখাটো অস্ত্রোপচার বা নিয়মিত চিকিৎসা পদ্ধতিও আবার প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, কারণ কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না।

তাহলে এখন বাংলাদেশের কী করা উচিত?

প্রথমত, দেশজুড়ে প্রতিরোধী জীবাণু ও সংক্রমণের প্রবণতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী জাতীয় AMR নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি হাসপাতাল ও আইসিইউতে বাধ্যতামূলক Antimicrobial Stewardship Program চালু করতে হবে, যাতে দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

তৃতীয়ত, Infection Prevention and Control (IPC) ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। যথাযথ হাত পরিষ্কার, জীবাণুমুক্তকরণ, নিরাপদ ভেন্টিলেটর ও ক্যাথেটার ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত আইসিইউ অডিট এবং সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

চতুর্থত, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে অপ্রয়োজনীয় ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধ হয়।

পঞ্চমত, চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে।

বাংলাদেশে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, অভিজ্ঞ চিকিৎসক এবং ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা অবকাঠামো রয়েছে। কিন্তু রোগী নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা ছাড়া কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোতে স্বচ্ছতা, রোগী নিরাপত্তা এবং বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর Root Cause Analysis (RCA)-এর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার শুধু হাসপাতালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের গবেষণায় প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি-সম্পর্কিত খাদ্যব্যবস্থায় উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ পাওয়া গেছে, বিশেষ করে tetracycline-এর মতো বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে। এটি মানব, প্রাণী এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্যের সমন্বিত “One Health” উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও “One Health Approach”-এর গুরুত্বের ওপর জোর দিচ্ছেন, যা মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য, কৃষি এবং পরিবেশের আন্তঃসম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলার আহ্বান জানায়।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, সংক্রমণ প্রতিরোধ, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যখাতের সুশাসনে বড় ধরনের উন্নতি না হলে আগামী কয়েক দশকে দক্ষিণ এশিয়াই AMR-সম্পর্কিত মৃত্যুর সর্বোচ্চ বোঝা বহন করতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবা মূলত বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেই বিশ্বাস রক্ষা করা হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকর্মী, নীতিনির্ধারক এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। অন্যথায়, অনেক আইসিইউ আধুনিক হাসপাতালের দেয়ালের আড়ালে চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, বরং নীরব হুমকিতে পরিণত হতে থাকবে।

সম্পর্কিত সংবাদ

Advertisement

Advertisement


ধন্যবাদ!

আপনার ইনবক্সে সর্বশেষ খবর পাঠানো হবে।

নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইমেইলে পান।

যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।