আর্কাইভ ভিডিও ই-পেপার
ব্রেকিং নিউজ
● ঢাকা কুমিল্লা এলিভেটেড রেলপথ: ৮১ কিলোমিটার কর্ড লাইনে খরচ ৮৩৯ বিলিয়ন টাকা ● মার্টিন শক্রেলি এফটিসি অবমাননা মামলা: ওষুধ শিল্পে আজীবন নিষেধাজ্ঞা ভাঙার অভিযোগ ● এনবিআর রাজস্ব আদায়: প্রথম প্রান্তিকে আয়কর বেড়েছে ১৭ শতাংশ, কমেছে ভ্যাট ● নিউইয়র্কে আইসিএর গুলি, গাড়িতে শিশু: অস্কার বেলগাল আহত, প্রতিবাদে উত্তাল শহর ● অ্যানথ্রোপিকের সতর্কতা: 'এআই ওয়ার্ম' মাত্র কয়েক মাসে স্মার্ট হোম ডিভাইসে স্বয়ং-প্রতিলিপি করতে পারে ● ট্রাম্প প্রশাসন রুশ হামলা আমেরিকান ব্যবসা ইউক্রেন: হোয়াইট হাউসের মৌনতা ও কীভের আপত্তি ● বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল বিপরীতে অস্ট্রেলিয়ার জয়, স্কোরকার্ডে দেখা গেল দুটি একদিনীয় ম্যাচের ফলাফল ● লেকার্সের রোস্টার সংকটে ডল্টন নেক্টের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, ট্রেড বা কাটের সম্ভাবনা ● ঢাকা কুমিল্লা এলিভেটেড রেলপথ: ৮১ কিলোমিটার কর্ড লাইনে খরচ ৮৩৯ বিলিয়ন টাকা ● মার্টিন শক্রেলি এফটিসি অবমাননা মামলা: ওষুধ শিল্পে আজীবন নিষেধাজ্ঞা ভাঙার অভিযোগ ● এনবিআর রাজস্ব আদায়: প্রথম প্রান্তিকে আয়কর বেড়েছে ১৭ শতাংশ, কমেছে ভ্যাট ● নিউইয়র্কে আইসিএর গুলি, গাড়িতে শিশু: অস্কার বেলগাল আহত, প্রতিবাদে উত্তাল শহর ● অ্যানথ্রোপিকের সতর্কতা: 'এআই ওয়ার্ম' মাত্র কয়েক মাসে স্মার্ট হোম ডিভাইসে স্বয়ং-প্রতিলিপি করতে পারে ● ট্রাম্প প্রশাসন রুশ হামলা আমেরিকান ব্যবসা ইউক্রেন: হোয়াইট হাউসের মৌনতা ও কীভের আপত্তি ● বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল বিপরীতে অস্ট্রেলিয়ার জয়, স্কোরকার্ডে দেখা গেল দুটি একদিনীয় ম্যাচের ফলাফল ● লেকার্সের রোস্টার সংকটে ডল্টন নেক্টের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, ট্রেড বা কাটের সম্ভাবনা
সাফল্যের গল্প

বেল ল্যাবস থেকে কমিউনিটি নেতৃত্বে: ড. মনোয়ার হোসাইনের অনন্য উত্তরাধিকার

8 • 1 min read fb x
বেল ল্যাবস থেকে কমিউনিটি নেতৃত্বে: ড. মনোয়ার হোসাইনের অনন্য উত্তরাধিকার
বেল ল্যাবস থেকে কমিউনিটি নেতৃত্বে: ড. মনোয়ার হোসাইনের অনন্য উত্তরাধিকার

আল মামুন

ড. মনোয়ার হোসাইনের অসাধারণ জীবনযাত্রা বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং কমিউনিটির প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের এক অনন্য গল্প।

বিশ্বখ্যাত AT&T Bell Labs-এ ৪২ বছর কর্মজীবন অতিবাহিত করার পাশাপাশি নিউ জার্সির বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য কয়েক দশক ধরে কাজ করেছেন তিনি। সম্প্রতি সন্তান ও নাতি-নাতনিদের কাছাকাছি থাকার জন্য তিনি মেরিল্যান্ডের কলাম্বিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন। তাঁর নিউ জার্সি ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে জীবনের একটি অসাধারণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। তবে তিনি যে উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার প্রযুক্তির শীর্ষ পর্যায়ে

১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন ড. হোসাইন। সঙ্গে ছিল বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত শক্তিশালী শিক্ষাগত ভিত্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি এবং উভয় ক্ষেত্রেই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৭৮ সালে তাত্ত্বিক উচ্চশক্তির পদার্থবিজ্ঞানে (Theoretical High-Energy Physics) পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণার ফলাফল হিসেবে ছয়টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় Physical Review সাময়িকীতে, যা আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক জার্নাল।

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও এক বছর গবেষণা ও শিক্ষকতার পর তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা ও শিক্ষাকতায় থেকে যাওয়ার পরিবর্তে যোগ দেন AT&T Bell Labs-এ—বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে।

এই সিদ্ধান্তই তাঁকে টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তির অগ্রভাগে চার দশকেরও বেশি সময়ের এক বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের পথে এগিয়ে দেয়।

বেল ল্যাবসে ৪২ বছরের কর্মজীবন

৪২ বছরের কর্মজীবনে ড. হোসাইন টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজ করেছেন।

প্রথম আট বছর কারিগরি নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনের পর তাঁকে Distinguished Member of Technical Staff পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির কারিগরি বিভাগে এটি ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের পদমর্যাদাগুলোর একটি।

পরবর্তী সময়ে তিনি নির্বাহী ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হন এবং একপর্যায়ে AT&T-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। এই পদে তিনি ৯০০ জনেরও বেশি পেশাজীবীর একটি দলের নেতৃত্ব দেন। AT&T-তে এই পর্যায়ের নেতৃত্বে পৌঁছানো প্রথম বাংলাদেশি ছিলেন তিনি। তাঁর এই অর্জন পরবর্তী প্রজন্মের বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করে।

ড. হোসাইনের কর্মজীবনে গভীর কারিগরি জ্ঞান ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের এক বিরল সমন্বয় দেখা যায়। সহকর্মীদের কাছে তিনি কৌশলগত চিন্তাবিদ, দূরদর্শী নির্বাহী এবং দক্ষ দল গড়ার কারিগর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলধারায় আসার আগেই উদ্ভাবন

ড. হোসাইনের কর্মজীবনের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো—এমন কিছু প্রযুক্তির বিকাশে তাঁর সম্পৃক্ততা, যেগুলো পরবর্তী সময়ে আধুনিক প্রযুক্তির সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।

তাঁর কাজের মধ্যে ছিল নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপের সময় টেলিফোন যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা, ডেটা কমিউনিকেশন আর্কিটেকচার তৈরি, AT&T-এর অবকাঠামোকে অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রূপান্তরে সহায়তা, সফটওয়্যার-নির্ভর নেটওয়ার্কের নকশা তৈরি এবং AT&T-এর বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনায় সহায়ক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা উন্নয়ন।

AT&T-এর সেলুলার টেলিযোগাযোগ ব্যবসার সম্প্রসারণেও তাঁর নেতৃত্বাধীন দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে ছিল এমন উন্নত সফটওয়্যার ব্যবস্থা তৈরি, যা মেশিন লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কৌশল ব্যবহার করে নেটওয়ার্কের সমস্যা পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও শনাক্ত করতে পারত। পাশাপাশি ন্যূনতম মানবিক হস্তক্ষেপে সমস্যা সমাধানের জন্য কর্মী পাঠানো এবং মেরামতের প্রক্রিয়া শুরু করার ব্যবস্থাও ছিল এতে।

আজকের মতো সহজলভ্য এআই প্রযুক্তি যখন ছিল না, তখনই এ ধরনের উদ্ভাবনী কাজ সম্পন্ন হয়।

তাঁর উন্নয়ন দলগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত পেশাজীবীরা ছিলেন, যা আধুনিক প্রযুক্তি উন্নয়নের আন্তর্জাতিক চরিত্রকে তুলে ধরে।

AT&T-তে উদ্ভাবনী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ড. হোসাইন ৩০টি পেটেন্টের অধিকারী হন। এ ছাড়া তিনি একাধিক Software Excellence Award এবং AT&T-এর মর্যাদাপূর্ণ Dev Oscar Award-সহ বিভিন্ন করপোরেট সম্মাননা অর্জন করেন।

মানুষের সাফল্যেই সাফল্যের প্রকৃত পরিমাপ

প্রযুক্তিগত অর্জনের বাইরে ড. হোসাইন মনে করেন, তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক দিকগুলোর একটি ছিল মানুষকে পরামর্শ দেওয়া, দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং তাঁদের পেশাগত উন্নয়নে সহায়তা করা।

তাঁর ব্যবস্থাপনার দর্শন কেবল ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং মানুষের সাফল্য নিশ্চিত করাই ছিল এর অন্যতম মূল লক্ষ্য।

ড. হোসাইনের জীবন ও কর্মের নীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • পরিবারকে সবার আগে রাখা।

  • মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করা।

  • সততা ও নৈতিকতার পথে চলা।

  • বিশ্বাস ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করা।

  • উৎকর্ষ অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা।

  • কখনো শেখা বন্ধ না করা।

  • কঠিন সময়ে হতাশ না হওয়া।

  • সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুটিই জীবনের যাত্রার অংশ, তা উপলব্ধি করা।

  • নিজের সাফল্যে যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাঁদের কখনো ভুলে না যাওয়া।

কর্মজীবনে যেসব কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সহকর্মীকে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন এবং গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন, তাঁদের পেশাগত জীবনে এই নীতিগুলো তাঁর উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে রয়েছে।

নিউ জার্সিতে বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে তোলা

ড. হোসাইন যখন আমেরিকার টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখছিলেন, তখন তিনি ও তাঁর স্ত্রী নিজ আবাসভূমির কাছাকাছি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজেও যুক্ত ছিলেন—একটি কমিউনিটি গড়ে তোলা।

১৯৭৯ সালে তাঁরা নিউ জার্সিতে আসার সময় রাজ্যটিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই কম। আশির দশকের শেষভাগে ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় বাংলাদেশি পরিবার সেখানে বসবাস শুরু করলে ড. হোসাইন ও অন্যান্য কমিউনিটি নেতা উপলব্ধি করেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধন অক্ষুণ্ন রাখতে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

তাঁরা এমন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে কাজ করেন, যেখানে বাংলাদেশি-আমেরিকানরা একত্র হতে পারবেন, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলবেন, পরস্পরকে সহযোগিতা করবেন, অভিন্ন আগ্রহের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবেন এবং নতুন প্রজন্মকে তাদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত করাতে পারবেন।

ড. হোসাইন বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউ জার্সির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠনটি ১৯৯৪ সালে নিউ জার্সিতে ফোবানা (FOBANA) সম্মেলনের আয়োজন করে।

তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব নিউ জার্সি (BANJ)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার সংগঠনটির সভাপতি ও উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০১১ সালে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সম্মেলন ফোবানা দ্বিতীয়বারের মতো নিউ জার্সিতে ফিরে এলে তিনি সম্মেলন কমিটির প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন।

কমিউনিটির জন্য কয়েক দশকের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি BANJ তাঁকে Lifetime Achievement Award বা আজীবন সম্মাননা প্রদান করে।

তবে কমিউনিটির অনেকের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান কোনো পদবি বা পুরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর অবদান ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বন্ধুত্ব, সংগঠন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষকে একত্র করার উদ্যোগের মধ্যে।

৫০ বছরের দাম্পত্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা

ড. হোসাইনের পেশাগত ও সামাজিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক অসাধারণ দাম্পত্য সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার ইতিহাস।

তাঁর স্ত্রী ড. খুরশিদ হোসাইন (লুসি) ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন থেকে তাত্ত্বিক কঠিন অবস্থা পদার্থবিজ্ঞানে (Theoretical Solid-State Physics) পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে তাঁরা দুজনই বেল ল্যাবসে যোগ দেন।

ড. খুরশিদ হোসাইন Member of Technical Staff হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। AT&T বিভক্ত হওয়ার পর তিনি AT&T ও Lucent-এ সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন। তাঁর কাজের ক্ষেত্রের মধ্যে ছিল নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা নিরাপত্তা, পিবিএক্স (PBX) ব্যবস্থা, নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।

পুরো কর্মজীবনে তিনি ড. হোসাইনের পেশাগত ও সামাজিক অঙ্গীকারের প্রতি অবিচল সমর্থন দিয়ে গেছেন।

২০২৫ সালে নিউ জার্সিতে এই দম্পতি তাঁদের বিবাহিত জীবনের ৫০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করেন। দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে রাজ্যটি ছিল তাঁদের আবাসভূমি।

তাঁদের জীবনকাহিনি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্মান, অভিন্ন মূল্যবোধ ও পরিবারকেন্দ্রিক জীবনেরও গল্প।

নিউ জার্সির শিকড়ে বেড়ে ওঠা পরিবার

তাঁদের দুই মেয়ে, আনজুম ও মেহরিন, নিউ জার্সিতে বেড়ে উঠেছেন। রাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁরা পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

আনজুম বর্তমানে স্বামী ড. ফাহিম মালিক এবং সন্তান রনিয়া ও জিবরানকে নিয়ে মেরিল্যান্ডের বেথেসডায় বসবাস করছেন। মেহরিন তাঁর স্বামী ইমরান রশিদ এবং সন্তান ইনায়া, ইব্রাহিম ও আয়ানকে নিয়ে মেরিল্যান্ডের এলিকট সিটিতে থাকেন।

২০২৬ সালের জুনে হোসাইন পরিবার মেরিল্যান্ডের কলাম্বিয়ায় চলে যায়। এর মধ্য দিয়ে নিউ জার্সিতে তাঁদের চার দশকেরও বেশি সময়ের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এবং সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সান্নিধ্যে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

শিকড়ের স্মৃতিচারণ

ড. হোসাইনের জীবনের যাত্রা বেল ল্যাবসের অনেক আগে শুরু হয়েছিল।

তিনি স্নেহভরে স্মরণ করেন তাঁর বাবা মোশাররফ হোসাইন তালুকদার ও মা রওশন আরা হোসাইনকে। তাঁর বাবা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। চাকরির কারণে তাঁকে বিভিন্ন স্থানে বদলি হতে হতো। ফলে পরিবারের সদস্যদের দেশের নানা অঞ্চলে বসবাসের অভিজ্ঞতা হয়।

তাঁর মায়ের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায় তিনিই ড. হোসাইনের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি করেন। এর মাধ্যমে বিজ্ঞান ও গণিতের প্রতি যে কৌতূহলের জন্ম হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

মেহেরপুরে বসবাসের সময় তিনি মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় অংশ নেন এবং যশোর বোর্ডে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পড়াশোনার জন্য ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখেন।

ঢাকার শ্রেণিকক্ষ থেকে বেল ল্যাবসের গবেষণাগার পর্যন্ত তাঁর যাত্রা প্রমাণ করে, শিক্ষা, কৌতূহল, অধ্যবসায় ও চারিত্রিক দৃঢ়তা কীভাবে মহাদেশের সীমানা পেরিয়ে সাফল্যের দরজা খুলে দিতে পারে।

কৃতজ্ঞতা, বিশ্বাস ও পরিপূর্ণ জীবনের গল্প

নিউ জার্সিতে চার দশকেরও বেশি সময়ের জীবন ফিরে দেখতে গিয়ে ড. হোসাইন তাঁর অর্জনের চেয়ে মানুষের কথাই বেশি স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, “চার দশক ধরে গড়ে ওঠা গভীর সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের স্মৃতি আমরা অত্যন্ত ভালোবাসার সঙ্গে মনে রাখব। এই অসাধারণ যাত্রায় নিউ জার্সির বাংলাদেশি কমিউনিটি আমাদের যে ভালোবাসা, সম্মান ও সহযোগিতা দিয়েছে, তার জন্য আমরা চিরকৃতজ্ঞ।”

জীবনের সাফল্য ও কঠিন সময়—উভয় ক্ষেত্রেই স্ত্রীর অবিচল সমর্থনের কথাও তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন। পরিবার, সততা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি তাঁদের অভিন্ন অঙ্গীকার ছিল এমন কিছু মূল্যবোধ, যা তাঁরা সন্তানদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন।

ড. হোসাইনের জীবনে ধর্মীয় বিশ্বাস আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাকে সুস্বাস্থ্য, একটি অসাধারণ পরিবার, অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং পরিপূর্ণ জীবন দান করেছেন—এ জন্য আমি তাঁর কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আমি প্রতিদিন তাঁর রহমত ও হেদায়েত কামনা করে যাচ্ছি।”

পদবি ও পেটেন্টের ঊর্ধ্বে এক উত্তরাধিকার

ড. মনোয়ার হোসাইনের উত্তরাধিকারকে শুধু তাঁর ৩০টি পেটেন্ট, AT&T-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন, বেল ল্যাবসে কয়েক দশকের কর্মজীবন কিংবা অর্জিত পুরস্কারের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না।

তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার নিহিত রয়েছে যাঁদের তিনি পরামর্শ দিয়েছেন ও গড়ে তুলেছেন, যেসব প্রযুক্তির বিকাশে অবদান রেখেছেন, যেসব পেশাজীবীকে অনুপ্রাণিত করেছেন, যেসব সংগঠন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন এবং যে কমিউনিটির সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন—সেসবের মধ্যে।

তিনি এমন এক প্রজন্মের বাংলাদেশি-আমেরিকানদের প্রতিনিধি, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন যখন দেশটিতে বাংলাদেশি কমিউনিটি তখনো প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। নিজেদের উদ্যোগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাঁরা সেই কমিউনিটিকে একটি প্রাণবন্ত, সুসংগঠিত ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ জনগোষ্ঠীতে রূপ দিতে সাহায্য করেছেন।

ড. হোসাইন যখন মেরিল্যান্ডে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করছেন, তখন নিউ জার্সি বিদায় জানাচ্ছে শুধু একজন বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদকে নয়; বিদায় জানাচ্ছে একজন পরামর্শদাতা, কমিউনিটি সংগঠক, নিবেদিতপ্রাণ পারিবারিক মানুষ এবং পথিকৃৎকে।

শেষ পর্যন্ত ড. মনোয়ার হোসাইনের জীবনকাহিনি উদ্দেশ্যপূর্ণ সাফল্যের গল্প—উদ্ভাবনের জন্য জ্ঞানকে কাজে লাগানো, অন্যদের এগিয়ে নিতে নেতৃত্ব দেওয়া এবং আজীবন সেবার মাধ্যমে নিজের গণ্ডি ছাড়িয়ে সুদূরপ্রসারী উত্তরাধিকার গড়ে তোলা।

সম্পর্কিত সংবাদ



ধন্যবাদ!

আপনার ইনবক্সে সর্বশেষ খবর পাঠানো হবে।

নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইমেইলে পান।

যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।