ঢাকা: দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে নবম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হতে পারে। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ বিষয়ে নীতিগত আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া পেনশন সুবিধা ও বিভিন্ন ভাতাও বাড়ানোর সুপারিশ রয়েছে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, একবারে পুরো পে-স্কেল কার্যকর না করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর।
২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর।
২০২৮-২৯ অর্থবছরে নতুন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা যুক্ত করা।
এভাবে সরকারের ওপর এককালীন আর্থিক চাপ কমানো হবে।
সরকারের কত টাকা অতিরিক্ত লাগবে? এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকার বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে বলে বেতন কমিশনের হিসাব বলছে।
তবে প্রথম ধাপে বাস্তবায়নের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই অর্থ আসবে কোথা থেকে এনিয়ে সবার মধ্যে প্রশ্ন জটলা বাঁধছে। অর্থনীতিবিদ ও সরকারি সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে-স্কেলের অর্থায়নের জন্য সরকার কয়েকটি উৎসের ওপর নির্ভর করতে পারে:
১. রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী অর্থবছরে কর ও ভ্যাট আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করছে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেলে পে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ এখান থেকে মেটানো সম্ভব হবে।
২. ব্যয় সংকোচন
সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় পুনর্বিন্যাস এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি খরচ কমানোর নীতি অনুসরণ করছে। নতুন পে-স্কেলের জন্য কিছু অর্থ এই সাশ্রয় থেকে আসতে পারে।
৩. ঋণ গ্রহণ
প্রয়োজনে সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। তবে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করলে মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
৪. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক সহায়তা
সরকার আশা করছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সহায়তার ফলে সামগ্রিক রাজস্ব সক্ষমতা বাড়বে, যা অতিরিক্ত বেতন ব্যয় বহনে সহায়ক হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের হাতে বেশি অর্থ গেলে ভোগব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা বাজারে চাহিদা বাড়াবে এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে। তবে একই সঙ্গে যদি উৎপাদন ও রাজস্ব আয় সমান হারে না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে।
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বৃদ্ধি করা, অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। তবে এর সফল বাস্তবায়ন অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারের রাজস্ব আদায় সক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।