বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার যুগ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের সাইবার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। রাজধানী ঢাকায় সম্প্রতি স্থাপিত এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) চালিত ট্রাফিক ক্যামেরা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে একদল প্রতারক নাগরিকদের কাছে ভুয়া ট্রাফিক জরিমানার বার্তা পাঠিয়ে অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে।
সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে এআই-চালিত ট্রাফিক নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করেছে কর্তৃপক্ষ। এই আধুনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সিগন্যাল অমান্য, অবৈধ লেন পরিবর্তন, অতিরিক্ত গতি এবং ভুল পার্কিংসহ বিভিন্ন ট্রাফিক আইন ভঙ্গ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। এরপর ডিজিটাল পদ্ধতিতে গাড়ির মালিকের কাছে জরিমানার নোটিশ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু এই নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তিকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সাইবার অপরাধী চক্র। তারা মোবাইল ফোনে এমন ভুয়া এসএমএস পাঠাচ্ছে, যা দেখতে অনেকটাই সরকারি ট্রাফিক জরিমানার নোটিশের মতো। বার্তাগুলোতে দাবি করা হচ্ছে যে, এআই ক্যামেরায় গাড়ির ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ছবি ধরা পড়েছে এবং দ্রুত জরিমানা পরিশোধ না করলে অতিরিক্ত জরিমানা, ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত কিংবা আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।
এসব বার্তার সঙ্গে একটি লিংক যুক্ত থাকে, যা ব্যবহারকারীকে একটি ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। দেখতে সরকারি পেমেন্ট পোর্টালের মতো হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটি একটি ফিশিং ওয়েবসাইট। সেখানে প্রবেশ করে কেউ যদি মোবাইল ব্যাংকিং তথ্য, এটিএম কার্ড নম্বর, পিন, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি প্রদান করেন, তাহলে প্রতারকরা সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে অর্থ হাতিয়ে নিতে পারে।
ইতোমধ্যে কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন যে, তারা ভুয়া ট্রাফিক জরিমানা পরিশোধ করতে গিয়ে হাজার হাজার টাকা হারিয়েছেন। একজন ভুক্তভোগী জানান, জরিমানার টাকা দেওয়ার জন্য লিংকে প্রবেশ করার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা উধাও হয়ে যায়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের প্রতারণায় মূল অস্ত্র হচ্ছে “ভয়” এবং “জরুরি পরিস্থিতির চাপ”। প্রতারকরা সাধারণত বার্তায় উল্লেখ করে যে, ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জরিমানা না দিলে দ্বিগুণ ফাইন হবে অথবা মামলা করা হবে। ফলে আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই যাচাই-বাছাই না করেই লিংকে ক্লিক করছেন।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, কোনো সরকারি ট্রাফিক জরিমানার ক্ষেত্রে কখনোই ওটিপি, পিন নম্বর, সিভিভি বা ব্যাংক পাসওয়ার্ড চাওয়া হয় না। সরকার অনুমোদিত নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম ছাড়া অন্য কোথাও অর্থ পরিশোধ না করার জন্যও নাগরিকদের সতর্ক করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) নাগরিকদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ দিয়েছে—
অপরিচিত এসএমএসের লিংকে ক্লিক করবেন না।
ট্রাফিক জরিমানার সত্যতা সরকারি ওয়েবসাইট বা অফিসিয়াল সূত্র থেকে যাচাই করুন।
কোনো অবস্থাতেই ওটিপি, পিন বা ব্যাংক পাসওয়ার্ড শেয়ার করবেন না।
ওয়েবসাইটের ঠিকানা ভালোভাবে যাচাই না করে কোনো তথ্য প্রদান করবেন না।
সন্দেহজনক বার্তা পেলে সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে জানান।
ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহার করুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবা ও এআই প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, ততই সাইবার নিরাপত্তা ও জনসচেতনতার গুরুত্ব বাড়বে। অন্যথায় প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি প্রতারণার ঝুঁকিও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।