আর্কাইভ ভিডিও ই-পেপার
ব্রেকিং নিউজ
বাংলাদেশ

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা: শুধু রূপান্তর নয়, এখন উচ্চ শিক্ষার ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে কল্পনা করার উওম সময়

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা: শুধু রূপান্তর নয়, এখন উচ্চ শিক্ষার ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে কল্পনা করার উওম সময়
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা: শুধু রূপান্তর নয়, এখন উচ্চ শিক্ষার ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে কল্পনা করার উওম সময়

সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে আজই উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ এখন জাতীয় উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দ্রুত ডিজিটাল বিস্তার এবং বৈশ্বিক সংযোগ বৃদ্ধি পেলেও উচ্চশিক্ষা খাতে নানা গভীর সংকট দেশে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার অভাব, দুর্বল গবেষণা সংস্কৃতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের দ্রুত অগ্রগতি আমাদের বিদ্যমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে সামনে তুলে নিয়ে এসেছে।

এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রশ্ন সামনে এসেছে—

বাংলাদেশ কি শুধু উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে রূপান্তর (transform) করবে, নাকি প্রথমে নতুনভাবে কল্পনা (Reimagine) করবে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতিতে সফলভাবে রূপান্তরিত হতে পারবে কিনা।

শুধু রূপান্তর যথেষ্ট নয়,গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তার ঘটেছে দ্রুত। বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী এবং ভর্তি সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু এই পরিমাণগত অগ্রগতির পাশাপাশি বহু কাঠামোগত দুর্বলতা এখনও রয়ে গেছে।

এখনও অনেক ক্ষেত্রে মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাতের দুর্বল সংযোগ, সীমিত হাতে কলমে শিক্ষা ও গবেষণা সংস্কৃতি এবং শহর-গ্রামের বৈষম্য বিদ্যমান। প্রযুক্তি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলেও শুধুমাত্র প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, যদি শিক্ষার মৌলিক দর্শন পরিবর্তিত না হয়।

উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য ও দিকনির্দেশনা পুনর্নির্ধারণ না করলে বাংলাদেশ হয়তো কেবল পুরোনো ব্যবস্থার আধুনিক সংস্করণ তৈরি করবে, কিন্তু ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে না।

এক্ষনে দেশের উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধুই ডিগ্রিধারী ও চাকরিপ্রার্থী তৈরি করবে, নাকি হবে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, গবেষণা এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্র?

বাংলাদেশ যখন উন্নত দেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং জ্ঞান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা সময় এখনই।

বিশ্বের শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি কাজের ধরনকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। ভবিষ্যতের গ্র্যাজুয়েটদের শুধু একাডেমিক জ্ঞান নয়, সমালোচনামূলক চিন্তা, ডিজিটাল দক্ষতা, যোগাযোগ, অভিযোজন ক্ষমতা, আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা মানসিকতাও প্রয়োজন হবে।

কিন্তু এখনও অনেক শিক্ষাক্রম সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে মুখস্থ শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে শিক্ষা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।

প্রচলিত ডিগ্রি ব্যবস্থার বাইরে ভাবতে হবে- আউট অফ দা বক্স চিন্তা জরুরী।

বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষায় বড় পরিবর্তন আসছে। লাইফলং লার্নিং, মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল, নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা, অনলাইন শিক্ষা এবং শিল্পখাতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশের এখন সুযোগ আছে পুরোনো মডেল অতিক্রম করে ২১শ শতাব্দীর বাস্তবতার উপযোগী একটি উদ্ভাবনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার।

দেশের জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ গুরুত্ব পূর্ন।

বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং স্মার্ট অর্থনীতি গঠন, ডিজিটাল রূপান্তর, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন। এই লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন, স্টার্টআপ, নীতিনির্ধারণ এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। উচ্চশিক্ষাকে আর জাতীয় উন্নয়নের বাইরে রাখা যাবে না।

বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষায় প্রথমে দরকার ভিশনের, তারপর রূপান্তর।

প্রথমে উচ্চ শিক্ষায় একটি স্পষ্ট জাতীয় ভিশন নির্ধারণ করতে হবে। এরপর শুরু করা যেতে পারে বাস্তব রূপান্তর—যার মধ্যে থাকবে পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, এআই-ভিত্তিক শিক্ষা, ব্যবহারিক শিক্ষা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব।

তবে এসব পরিবর্তন তখনই কার্যকর হবে, যখন তা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল ও শিক্ষাদর্শনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।

দেশে উচ্চশিক্ষাকে নতুনভাবে কল্পনা (Reimagine) করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। সঠিক শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এই তরুণরাই হতে পারে আগামী দিনের উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি।

কিন্তু উচ্চশিক্ষা যদি ভবিষ্যতের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে শিক্ষিত কিন্তু বেকার জনগোষ্ঠী বাড়তে থাকবে, যা সামাজিক বৈষম্য, হতাশা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এখনই করণীয়: দুই ধাপের জাতীয় রোডম্যাপ তৈরী ও বাস্তবায়ন শুরু করা।

প্রথম ধাপ: উচ্চশিক্ষাকে নতুনভাবে কল্পনা (Reimagine) করা।

বিশ্ববিদ্যালয়, নীতিনির্ধারক, শিল্পখাত, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে জাতীয় সংলাপ শুরু করতে হবে, যাতে Vision 2041-এর আলোকে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা যায়।

দ্বিতীয় ধাপ: উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর (Transform)।

একটি জাতীয় ভিশন নির্ধারণের পর পাঠ্যক্রম সংস্কার, ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ, গবেষণা উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা এবং প্রশাসনিক আধুনিকায়নের মাধ্যমে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এখন আর ছোটখাটো সংস্কার যথেষ্ট নয়।

কারণ, নতুনভাবে কল্পনা ছাড়া শুধুমাত্র রূপান্তর পুরোনো ব্যবস্থার আরও দক্ষ সংস্করণ তৈরি করতে পারে।

একটি সত্যিকারের উদ্ভাবনী, বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক এবং জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রথমে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যকে নতুনভাবে ভাবতে হবে—তারপর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে রূপান্তর করতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করবে আজকের সিদ্ধান্তের উপর—আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগামী প্রজন্মকে কীভাবে প্রস্তুত করছে তার উপর।

সম্পর্কিত সংবাদ

Advertisement

Advertisement


ধন্যবাদ!

আপনার ইনবক্সে সর্বশেষ খবর পাঠানো হবে।

নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইমেইলে পান।

যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।