ব্যাংক অব কানাডা আজ বুধবার নীতি সুদের হার ঘোষণা করবে। অনেক অর্থনীতিবিদ ধারণা করছেন, ব্যাংক অব কানাডা সুদের হার তিন বছরের মধ্যে প্রথমবার বাড়াতে পারে।
গ্লোবাল নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর্থিক বাজার ও রয়টার্সের এক জরিপে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদেরা ধরে নিচ্ছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার এক-চতুর্থাংশ শতাংশ পয়েন্ট বাড়াবে। তা হলে এটি হবে ২০২৩ সালের জুলাইয়ের পর মূল সুদহারের প্রথম বৃদ্ধি।
এই সিদ্ধান্ত গুরুত্ব পাচ্ছে দুটি বিপরীত চাপের কারণে। ইরান যুদ্ধ ও অন্যান্য ভূরাজনৈতিক সংঘাতে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে। অন্যদিকে অর্থনীতি দুর্বল, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চাকরিও কমেছে।
ব্যাংক অব কানাডার বর্তমান সুদের হার কত, কেন এখন বৃদ্ধির চাপ
গ্লোবাল নিউজ জানিয়েছে, ব্যাংক অব কানাডার নির্ধারিত সুদহার, যা দেশে ঋণের সুদের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২.২৫ শতাংশে রয়েছে। ওই সময় হার ২.৫ শতাংশ থেকে কমানো হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেল ও গ্যাসের বাড়তি দামের প্রভাব শুধু জ্বালানি পাম্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না, অন্যান্য পণ্য ও সেবার দামও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর হার বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে।
সুদহারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ব্যাংক অব কানাডা মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হালনাগাদ পূর্বাভাসও প্রকাশ করবে।
একবার নাকি ধারাবাহিক কানাডা সুদের হার বৃদ্ধি
সিবিসি জানিয়েছে, বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই ব্যাংক অব কানাডা সুদহার বাড়াবে। তবে কবে এবং কতটা বাড়বে, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ আছে।
সিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত একবারের জন্য হার বদলায় না। তারা পরপর কয়েকটি সিদ্ধান্তে হার বাড়ানো বা কমানোর একটি চক্রে ঢোকে।
ম্যাককোয়ারি গ্রুপের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ডেভিড ডয়েল এমন চক্রই আশা করছেন। সিবিসির তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ধারণা, ব্যাংক আজ হার বাড়াবে এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত মোট ১২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়াতে থাকবে। তাতে ওভারনাইট রেট দাঁড়াবে ৩.৫ শতাংশে।
কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু ডিক্যাপুয়া ভিন্নমত দিয়েছেন। সিবিসিকে তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ থাকলেও কানাডার অর্থনীতি এখন দুর্বল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রায় এক লাখ চাকরি কমেছে এবং প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক পূর্বাভাসও ভালো নয়।
“অর্থনীতির এই গতি কমানোর দরকার নেই। আমাদের ব্রেক চাপার প্রয়োজন নেই,” বলেন ডিক্যাপুয়া।
তাঁর মতে, ব্যাংক আজ হার বাড়ালে সেটি একটি “বার্তা দেবে” যে ব্যাংক মূল্যস্ফীতির বিষয়টি দেখছে। এরপর আরও বৃদ্ধি সত্যিই প্রয়োজন কি না, তা দেখতে ব্যাংক অপেক্ষা করবে বলে তিনি ধারণা করছেন।
সিবিসি আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ কানাডার অর্থনীতিতে চাপ ফেলছে, যদিও অর্থনীতি এখনো টিকে থাকার সক্ষমতা দেখাচ্ছে।
কানাডা মর্টগেজ সুদের হার ও বাড়ি কেনায় কী প্রভাব পড়বে
আবাসন খাতের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, সিদ্ধান্তের আগেই সম্ভাব্য হার বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কানাডিয়ান রিয়েল এস্টেট অ্যাসোসিয়েশনের বরাতে সিবিসি জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে বাড়ি বিক্রি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৭.৭ শতাংশ কমেছে।
“এখন সবকিছু বেশ ধীরগতির,” বলেন মুভ স্মার্ট রিয়েলটির প্রেসিডেন্ট জন পাসালিস।
পাসালিসের ভাষ্য, বন্ডের ইল্ড বাড়ায় স্থির মর্টগেজ সুদহার বাড়ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হার অপরিবর্তিত রাখায় এর সঙ্গে যুক্ত পরিবর্তনশীল মর্টগেজ সুদহার এত দিন একই জায়গায় ছিল। হার বৃদ্ধির সম্ভাবনায় কিছু সম্ভাব্য ক্রেতা সতর্ক হয়ে আপাতত বাজার থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলেও তিনি জানান।
তাঁর মতে, ক্রেতারা কিছুটা প্রস্তুত থাকায় এক বা দুটি হার বৃদ্ধি বাড়ির বাজারে বড় প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলে আরও বেশি মানুষ বাড়ি না কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
“আগামী ছয় মাসে দুটি হার বৃদ্ধি এক জিনিস, কিন্তু চারটি হার বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে অনেক বড় ঘটনা,” বলেন পাসালিস।
আজ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভেরও সিদ্ধান্ত
সিবিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভও আজ পরে সুদহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে। গত মাসে হার বাড়ানোর পর এবার ফেড হার অপরিবর্তিত রাখবে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে মূল্যস্ফীতি উঁচুতে থাকায় বাজার ২০২৭ সালের মাঝামাঝির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আরও অন্তত দুটি হার বৃদ্ধির আশা করছে। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, সরকার ও করপোরেট খাতের বিপুল ঋণ এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা আর্থিক বাজারে চাপ তৈরি করছে।
থর্নবার্গ ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের ফিক্সড ইনকাম প্রধান ক্রিশ্চিয়ান হফম্যান রয়টার্সকে বলেন, “আমার মনে হয় না আজকের বাজারে ফেড পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে। ক্রমেই বড় বিষয় হয়ে উঠছে এআই-চালিত বিনিয়োগ চক্র এবং তা ঘিরে ঝুঁকি নেওয়ার মনোভাব কোন দিকে যায়।”
ব্যাংক অব কানাডা শেষ পর্যন্ত হার কতটা বদলায় এবং তার হালনাগাদ মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে কী থাকে, তা আজকের ঘোষণায় জানা যাবে।