হোয়াইট হাউসের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের পরিচালক কেভিন হ্যাসেট রোববার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডা বাণিজ্য চুক্তি এখন ‘খুব কাছাকাছি’। কয়েক দিন আগেই কানাডার পণ্যে শুল্কের তালিকায় রদবদল করে ট্রাম্প প্রশাসন।
তবে দুই সরকারের বক্তব্য পুরোপুরি মিলছে না। অটোয়ার প্রতিক্রিয়া সংযত। দ্য কানাডিয়ান প্রেসের খবর অনুযায়ী, আগস্টে ভেস্তে যাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য আলোচনা আর শুরু হয়নি।
শুক্রবার ঘোষিত শুল্ক পরিবর্তন ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। ফিন্যানশিয়াল পোস্ট জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস নিজেই বলেছে, কিছু পণ্যে শুল্ক ছাড় মেইন অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের আসন ধরে রাখার প্রচারণাকে সহায়তা করার চেষ্টা।
চুক্তি কি সত্যিই কাছে? ওয়াশিংটন আর অটোয়ার ভিন্ন সুর
ফক্স নিউজের এক সাক্ষাৎকারে হ্যাসেট এ মন্তব্য করেন। সিটিভি নিউজ অনুষ্ঠানটির নাম লিখেছে ‘ফক্স নিউজ সানডে’, আর ফিন্যানশিয়াল পোস্ট লিখেছে ‘দ্য সানডে ব্রিফিং’। হ্যাসেট বলেন, বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক পুরো সপ্তাহ ধরে কানাডার প্রতিপক্ষদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
সিটিভি নিউজের খবর অনুযায়ী হ্যাসেট বলেন, ‘আলোচনা গতি পেয়েছে। এটি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।’
শুল্কনীতি কেন এখনো চুক্তি আনতে পারেনি, এমন প্রশ্নে হ্যাসেট দায় চাপান ‘সদ্য হয়ে যাওয়া কানাডার নির্বাচন, আলবার্টার বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ’ ঘটনার ওপর। সিটিভি জানায়, তাঁর মতে এর ফলে ‘কানাডীয়দের সঙ্গে আলোচনা কার্যত অসম্ভব’ হয়ে পড়েছিল। অথচ সিটিভির তথ্য অনুযায়ী, এই সপ্তাহের শুরুতেই আলবার্টার ভোটাররা কানাডা ছাড়ার প্রশ্নে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা ফিন্যানশিয়াল পোস্টকে বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লুটনিক ও কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্লঁর মধ্যে আলোচনা বেড়েছে এবং তা চলছে। তবে ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, সম্ভাবনা এখনো অস্পষ্ট, কারণ যুক্তরাষ্ট্র মনে করে কানাডা যথেষ্ট প্রস্তাব দিচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট কেবল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো চুক্তিই অনুমোদন করবেন, বলেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সময়সীমা নিয়ে একেক সময় একেক কথা বলেছেন। রোববার মিশিগানের পোর্ট হিউরনে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘কানাডা বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রকে ঠকিয়ে আসছে, ঠিক আছে? বছরের পর বছর। আর আমাকে এটা করতেই হয়েছে। খুব শিগগির আমরা এর নিষ্পত্তি করব। তারা এই মুহূর্তে আমাদের যা খুশি দিতে রাজি।’ উদ্ধৃতিটি দিয়েছে দ্য কানাডিয়ান প্রেস।
ফিন্যানশিয়াল পোস্ট জানিয়েছে, ডেট্রয়েটের ফক্স ২-কে ট্রাম্প বলেন, ‘সম্ভবত কয়েক মাসের মধ্যে’ চুক্তি হতে পারে। পরে যোগ করেন, তা ‘আসল নির্বাচনের আগেও’ হতে পারে। সিটিভির খবর অনুযায়ী, শুক্রবার ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, চুক্তি কাছাকাছি এবং ‘সব তাস’ তাঁর দলের হাতে।
অন্যদিকে লেব্লঁর দপ্তর জানিয়েছে, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘গঠনমূলক সংলাপে রয়েছে’ এবং সর্বশেষ শুল্ক পদক্ষেপগুলো মূল্যায়ন করবে। ফিন্যানশিয়াল পোস্টের উদ্ধৃত বিবৃতিতে দপ্তরটি বলে, ‘কানাডার স্বার্থকে সম্মান করে এমন পারস্পরিকভাবে আরও লাভজনক বাণিজ্য সম্পর্কের লক্ষ্যে আমরা গঠনমূলকভাবে ও সরল বিশ্বাসে কাজ করতে প্রস্তুত।’
ফিন্যানশিয়াল পোস্ট আরও জানায়, প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বুধবার বলেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত হলে তিনিও ‘আলোচনায় বসতে প্রস্তুত’। তবে সেটি হতে হবে ‘কানাডীয়দের স্বার্থে একটি চুক্তি’।
কানাডার পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক: কোনটিতে উঠছে, কোনটিতে বসছে
শুক্রবার হোয়াইট হাউস জানায়, কানাডার কিছু পণ্য থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক তুলে নেওয়া হবে, আর অন্য কিছু পণ্যে নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক বসবে। পরিবর্তন কার্যকর হবে চলতি মাসের শেষে। কোন কোন পণ্য তালিকায় রয়েছে, তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের তথ্যে ভিন্নতা আছে:
- ছাড় পাচ্ছে (সিটিভি নিউজ): সামুদ্রিক শৈবাল, প্যাকিং বাক্স ও কিছু প্লাইউড শিট।
- ছাড় পাচ্ছে (ফিন্যানশিয়াল পোস্টকে উদ্ধৃত করে সিনেটর কলিন্স): প্লাইউড, ব্লিচ করা কাগজ, কার্টন ও বিশেষায়িত কৃষি যন্ত্রপাতি।
- নতুন শুল্ক (সিটিভি নিউজ): কোকো পাউডার, ভিনাইল মেঝে ও শ্যাম্পুসহ আরও কিছু পণ্য।
- নতুন শুল্ক (দ্য কানাডিয়ান প্রেস): কানাডার আবর্জনা ও পয়োবর্জ্যসহ কয়েক ডজন নতুন পণ্য।
সিটিভি জানিয়েছে, ধাতু, কাঠ ও গাড়িসহ কানাডার বহু পণ্যে আগে থেকেই মার্কিন শুল্ক রয়েছে। বিয়ার, মদ ও মোটরসাইকেলের আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
কাঠের মেঝে উৎপাদক প্রিভারকোর প্রধান নির্বাহী জঁ-ফ্রাঁসোয়া দুফ্রেন সিটিভিকে বলেন, তাঁদের পণ্যে নতুন শুল্ক পুরো খাতকে বিপর্যস্ত করতে পারে। ‘রাতারাতি আমরা ব্যবসার ২৫ শতাংশ হারাচ্ছি,’ বলেন তিনি। বৈঠক চেয়ে তিনি অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেনকে চিঠি দিয়েছেন।
সুসান কলিন্সের মেইন কেন শুল্ক ছাড় পাচ্ছে
দ্য কানাডিয়ান প্রেসের খবর অনুযায়ী, শুল্ক পরিবর্তনগুলো এসেছে কলিন্সের অনুরোধে। মেইন সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্য, বাণিজ্য বিরোধে বড় ধাক্কা খেয়েছে। নভেম্বরে পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকা কলিন্স শুল্ক প্রত্যাহারের কৃতিত্ব নিয়েছেন এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রতিবেশী, মিত্র ও বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার’ বলেছেন, জানায় সিটিভি।
ফিন্যানশিয়াল পোস্টের খবরে হ্যাসেট বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেইনের নাগরিকদের সবার আগে রেখেছেন।’ মেইন ও আলাস্কার মৎস্য খাতকে সহায়তা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের ‘প্রায় অন্য সব কাজের ঊর্ধ্বে’ ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মার্কিন কৃষি বিভাগ এপ্রিলে প্রথমবারের মতো সামুদ্রিক খাদ্য দপ্তর খোলে, আর প্রশাসন শুক্রবার ‘আমেরিকা ফার্স্ট সিফুড স্ট্র্যাটেজি’ ঘোষণা করে।
পত্রিকাটি আরও জানায়, গত মাসেও কলিন্সের অনুরোধে রাস্তার লবণসহ কিছু পণ্যে ট্রাম্প শুল্ক ছাড় দেন। কানাডাও তখন নিজের পাল্টা শুল্ক তালিকা থেকে সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য বাদ দেয়।
মেইনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসন সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, কলিন্স ‘আগুন নেভাতে এক কাপ পানি এনে কৃতিত্ব চাইছেন’, জানায় ফিন্যানশিয়াল পোস্ট।
দ্য কানাডিয়ান প্রেস জানিয়েছে, কংগ্রেসের দুই কক্ষই এখন রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে, তবে জরিপ বলছে ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে তারা একটি বা দুটি কক্ষই হারাতে পারে। ফিন্যানশিয়াল পোস্টের মতে, সীমান্তবর্তী দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য মিশিগানেও বাণিজ্যযুদ্ধ রিপাবলিকানদের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
আগস্টে আলোচনা ভেস্তে গিয়েছিল যে কারণে
দ্য কানাডিয়ান প্রেস জানায়, শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের তোলা দাবিগুলোকে কার্নি ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে আগস্টে আনুষ্ঠানিক আলোচনা থেকে সরে আসে তাঁর সরকার। এরপর ওয়াশিংটন কানাডার কয়েক বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক আরোপ করে, অটোয়াও মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক বসায়।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প নিজেই কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো চুক্তি করেছিলেন এবং একে দারুণ চুক্তি বলেছিলেন। তবু তিনি বারবার অভিযোগ করে আসছেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করছে।
নতুন মার্কিন পদক্ষেপ মূল্যায়নের পর অটোয়া নিজের পাল্টা শুল্কে পরিবর্তন আনবে কি না, তা জানায়নি। কানাডার কাছে আর কী চায়, ওয়াশিংটনও প্রকাশ্যে বলেনি।