ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উর্সুলা ভন ডার লায়েন বুধবার স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বার্ষিক 'স্টেট অব দি ইউনিয়ন' ভাষণে কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম 'অ্যাসোসিয়েট সদস্য' করার প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ভাষণে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি উপস্থিত ছিলেন; তিনি বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল। ভন ডার লায়েন বলেন, তিনি কানাডার জন্য 'দরজা খুলে দিতে' চান, যাতে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সম্পর্ক আরও ঘনীভূত হয়।
প্রস্তাবটির গুরুত্ব বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটেই বোঝা যায়। গত মাসে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ে, যার পরই নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়। ট্রাম্প বারবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের '৫১তম রাজ্য' বানানোর কথা বলে উত্তর আমেরিকার এই দুই প্রতিবেশীর দ্বন্দ্বকে আরও উসকে দিয়েছেন।
ট্রাম্পের তীব্র প্রতিক্রিয়া
ভন ডার লায়েন ট্রাম্পের নাম না নিয়ে বলেন, এটি 'অন্য কারও বিরুদ্ধে অংশীদারিত্ব' হবে না। তবু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রস্তাবটিকে 'হাস্যকর' বলে উড়িয়ে দেন এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য কেটে দেওয়ার হুমকি দেন। বিবিসি অনুযায়ী, ট্রাম্প বলেন, "যদি তারা তা করে, আর যদি আমার মনে হয় এটি শত্রুতাপূর্ণ কাজ, তবে আমি খুব কঠোর শুল্ক আরোপ করব বা অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করে দেব।"
তিনি আরও বলেন, "যদি তাদের উদ্দেশ্য ভালো হয়, তাহলে ঠিক আছে। আর খারাপ উদ্দেশ্য হলে আমরা ইউরোপের ওপর খুব ভারী শুল্ক বসাব, এটা একটা সম্ভাবনা।"
কেন কানাডাকে চায় ইউরোপ
ভন ডার লায়েন বলেন, "আমরা একসঙ্গে দাঁড়িয়েছি: ইউক্রেন, প্রতিরক্ষা, কাঁচামাল ও সরবরাহ শৃঙ্খলায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা... ইউরোপ ও কানাডা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে।" তাঁর ভাষায়, "অংশীদারিত্ব ইউরোপের জন্য কৌশলগত পছন্দ। কিন্তু এটি আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ভাঙনের প্রতিক্রিয়াও।"
বিবিসি জানায়, ভন ডার লায়েন সহযোগিতার মূল খাত হিসেবে উৎপাদন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিরক্ষা, শক্তি, জরুরি খনিজ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা বলেছেন। কার্নি গত সপ্তাহে ইইউর সঙ্গে 'অনন্য জোট' গড়ার কথা বলেছিলেন।
কানাডা ও ইইউর মধ্যে প্রায় এক দশক আগে স্বাক্ষরিত সিইটিএ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ৯৯ শতাংশ পণ্য রপ্তানি শুল্কমুক্ত। তবে জোটের ২৭ সদস্যের মধ্যে দশটি এখনো চুক্তিটি অনুমোদন করেনি।
অ্যাসোসিয়েট সদস্যপদ কী, বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব
ইইউতে 'অ্যাসোসিয়েট সদস্যপদ' নামে কোনো মর্যাদার অস্তিত্ব আপাতত নেই। বিবিসি বলছে, সম্মতি মিললেও প্রক্রিয়াটি বছরের পর বছর সময় নিতে পারে। ভন ডার লায়েন এটি কীভাবে কাজ করবে, তার কোনো নির্দিষ্ট খসড়া দেননি।
এ বছরের শুরুতে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎস ইউক্রেনকে এ ধরনের মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব দিলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছিল। আলবেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, মন্টিনেগ্রো, উত্তর মেসিডোনিয়া ও সার্বিয়া পূর্ণ সদস্যপদের লম্বা পথে রয়েছে; জর্জিয়া ও মলদোভাও আবেদন করেছে। কয়েকটি রাজধানী নতুন ধরনের সদস্যপদ না গড়ে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য চুক্তিই ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব
একই ভাষণে ভন ডার লায়েন রাশিয়ার হুমকির কথা উল্লেখ করে যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন, কানাডা ও নরওয়ের মতো অংশীদারদের নিয়ে একটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, "অনেক দিন ধরে আমরা আমাদের মহাদেশের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক একটি নেতৃস্থানীয় ফরম্যাট নিয়ে আলোচনা করছি, যেখানে কানাডা, নরওয়ে, ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য ও অন্যরা যুক্ত থাকবে।"
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণ আক্রমণের পর থেকে এ ধরনের সংস্থার দাবি জোরালো হয়েছে; ধারণাটি মূলত ফ্রান্স-জার্মানির। ট্রাম্প ন্যাটো জোট নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সমর্থন বেড়েছে, যদিও কেউ কেউ আশঙ্কা করেন এটি ন্যাটোর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।
কানাডায় বড় বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় প্রবাসী সম্প্রদায় বাস করে। দেশটির বাণিজ্য ও করনীতির যেকোনো বড় পরিবর্তন তাদের কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার খরচ ও রেমিট্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রস্তাবটি এখন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অনুমোদনের অপেক্ষায়। সবচেয়ে নিকটতম ঘটনা বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে কার্নির ভাষণ।