ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহান্তের বিক্ষোভে শনিবার সারা দেশে প্রায় ১,০০০ জনকে আটক করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শনিবার ফ্রান্সজুড়ে চার লাখ দশ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এর মধ্যে প্যারিসেই ছিলেন প্রায় এক লাখ দশ হাজার, যা আগের সপ্তাহের সংখ্যার কাছাকাছি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, এবারের বিক্ষোভ মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ছিল। আগের সপ্তাহান্তের মতো ব্যাপক সহিংসতাও হয়নি। তবে প্যারিস, মার্সেই ও বোর্দোতে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে।
আন্দোলনের পরবর্তী পরীক্ষা ৫ নভেম্বর। বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ ঘোষণা দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বিক্ষোভকারীদের দাবির জবাব না দিলে সেদিন দেশজুড়ে ধর্মঘট হবে। অস্থিরতা এখন আর শুধু ফ্রান্সেও সীমাবদ্ধ নেই। একই দিনে ইতালি, আলবেনিয়া ও বেলজিয়ামেও সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে।
ফ্রান্সে বিক্ষোভ কেন, দাবি কী
সিএনএনের খবর অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগ, তরুণ কর্মীদের জন্য বেশি সুযোগ এবং লাগামহীন জীবনযাত্রার ব্যয়ের সমাধান চাইছেন। ঠিক কোন নীতি বা ঘটনা থেকে এই আন্দোলনের সূচনা, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
শনিবার ছিল বিক্ষোভের দ্বিতীয় দফা। আগের শনিবার সারা দেশে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। সেবার ব্যাপক লুটপাট হয়েছিল, হামলা হয়েছিল টাউন হল ও থানার মতো সরকারি ভবনেও।
এবার সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিশাল নিরাপত্তা অভিযান চালানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশজুড়ে প্রায় ৭০,০০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন। সিএনএন জানায়, বিশেষায়িত সোয়াট ইউনিট, হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান, পুলিশ কুকুর ও জলকামানও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
প্যারিস থেকে মার্সেই: কোথায় কী ঘটেছে
ঘটনাস্থলে থাকা সিএনএনের একটি দল জানায়, প্যারিসের মিছিল শুরু থেকে শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু মিছিলের শেষ গন্তব্য পোর্ত দ্য ভ্যাঁসেনে পৌঁছানোর পর কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী পুলিশের মুখোমুখি হন। তাঁদের আটকাতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইয়ে খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষের সময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে মর্টার আতশবাজি ছোড়েন। খবরটি দিয়েছে সিএনএনের ফরাসি সহযোগী সংবাদমাধ্যম বিএফএমটিভি। চ্যানেলটি আরও জানায়, শহরের বিভিন্ন জায়গায় লুটপাট হয়েছে। একটি গয়নার দোকানের কাচ ভাঙা হয়েছে এবং একটি সুপারমার্কেট লুট হয়েছে।
আটলান্টিক উপকূলের শহর বোর্দোর প্লাস দ্য লা বুর্স চত্বরে বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে দেখা গেছে বলে সিএনএন জানায়। ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশধারী কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ছেন।
বিএফএমটিভির খবর অনুযায়ী, নিস শহরে কয়েক ডজন উগ্র ডানপন্থী কর্মী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মূল্যায়ন: হামলা কমেছে, তবে সহিংসতা তীব্র
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্যারিসে বড় একটি বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে, সারা দেশের বেশির ভাগ মিছিলের মতোই।’
তিনি জানান, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের চলাচল সীমিত রেখেছিল। ‘অননুমোদিত ভ্রাম্যমাণ বিক্ষোভ করতে বা শহরকেন্দ্রের দিকে যেতে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়েছে,’ বলেন তিনি।
নুনেজ বলেন, ‘কিছু শহরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষয়ক্ষতি বা লুটপাট হয়েছে, তবে তা খুবই সীমিত।’ তাঁর ভাষ্য, এর মাত্রা আগের সপ্তাহের চেয়ে অনেক কম। আগের সপ্তাহান্তের মতো এবার টাউন হল বা থানার মতো সরকারি ভবনে ‘কোনো লক্ষ্যভিত্তিক হামলা’ হয়নি বলেও জানান তিনি।
তবে নিরাপত্তা বাহিনীকে ‘অত্যন্ত উচ্চমাত্রার সহিংসতার’ মুখে পড়তে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন নুনেজ। তিনি বলেন, ‘অনবরত বিভিন্ন বস্তু ছোড়া হয়েছে, মর্টার আতশবাজি ছোড়া হয়েছে।’ লুটপাট ঠেকাতে শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন থাকবে বলেও জানান তিনি। আটক ব্যক্তিদের কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে, সিএনএনের প্রতিবেদনে তা জানানো হয়নি।
মাখোঁর জবাবের অপেক্ষা, ইউরোপের আরও তিন দেশে বিক্ষোভ
বামপন্থী দল লা ফ্রঁস অ্যাঁসুমিজের নেতা মেলঁশোঁ শনিবার প্যারিসের মিছিলের সামনের সারি থেকে বিএফএমটিভিকে বলেন, ‘একটি সাধারণ ধর্মঘট… ৫ নভেম্বর সরকারের মাথার ওপর ঝুলছে।’ সিএনএনের প্রতিবেদনে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বা তাঁর দপ্তরের কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না।
সিএনএন জানায়, শনিবার ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে:
- ইতালি: নেপলস, রোম ও মিলানে আগের বিক্ষোভে লুটপাটের পর এবার পূর্বঘোষিত কর্মসূচির আগেই দোকানগুলো জানালা বোর্ড দিয়ে ঢেকে দেয়।
- আলবেনিয়া: রাজধানী তিরানায় বিক্ষোভকারীরা ময়লার কনটেইনারে আগুন দেন এবং পাথর ও কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টার ছোড়েন।
- বেলজিয়াম: ব্রাসেলসে শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় ব্যারিকেড দেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ভিআরটির খবর অনুযায়ী, পুলিশ সেখানে জলকামান ব্যবহার করে।
বিক্ষোভকারীরা তৃতীয় সপ্তাহান্তেও রাস্তায় নামবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মেলঁশোঁর বেঁধে দেওয়া ৫ নভেম্বরের আগে মাখোঁ দাবিগুলোর জবাব দেবেন কি না, সেই প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।