তুরস্কের আন্তালিয়ায় আসন্ন কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের জলবায়ু অর্থায়নের দাবি হওয়া উচিত ঋণ নয়, অনুদান। জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ এম জাকির হোসেন খান গত শুক্রবার দ্য ক্লাইমেট ওয়াচে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক খানের মতে, যে সংকট বাংলাদেশ তৈরি করেনি, তা মোকাবিলা করতেই দেশটিকে ক্রমশ ঋণ নিতে হচ্ছে। একই সুরে দ্য ডেইলি স্টারে একটি মতামত নিবন্ধ লিখেছেন খুলনায় বেড়ে ওঠা এক গবেষক, যিনি মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সম্মেলনে যাচ্ছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো, ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যু অনেক কমেছে, কিন্তু পরিবারগুলো এখনো আয়ের পথ হারাচ্ছে।
দুটি লেখাই একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ও একজন গবেষকের মত। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান কোনোটিতেই উঠে আসেনি।
কপ৩১ কোথায়, কবে
জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন বা কপ৩১ অনুষ্ঠিত হবে তুরস্কের আন্তালিয়ায়। ডেইলি স্টারের নিবন্ধের লেখক জানিয়েছেন, তিনি ‘আগামী মাসে’ আন্তালিয়া যাবেন। সে হিসাবে সম্মেলন নভেম্বরে। তবে সুনির্দিষ্ট তারিখ দুই প্রতিবেদনের কোনোটিতে নেই।
এনডিসি ৩.০ অনুযায়ী বাংলাদেশের কত অর্থ দরকার
দ্য ক্লাইমেট ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এনডিসি ৩.০-তে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রশমনের জন্য ১১৬.১৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলে হিসাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯০.২৩ বিলিয়ন ডলার আসার কথা আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে। দেশের পূর্ণ অভিযোজন চাহিদা এই হিসাবের বাইরে।
‘এই ঘাটতি সাময়িক টান নয়; এটি একটি কাঠামোগত ঘাটতি,’ বলেন জাকির হোসেন খান। তাঁর ভাষ্য, প্রশমন পরিকল্পনার প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এমন অর্থের ওপর নির্ভরশীল, যা বাংলাদেশ নিজে জোগাড় করতে পারবে না।
খান অভিযোজনকে বলেছেন ‘লুকানো অর্ধেক’, যার বিল আরও বড় ও জরুরি। সাক্ষাৎকারে তিনি যে হিসাব দিয়েছেন:
- অভিযোজন চাহিদা: বছরে প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন ডলার
- আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থপ্রবাহ: বছরে প্রায় ০.৪ বিলিয়ন ডলার
- দেশীয় অর্থে জলবায়ু ব্যয়: মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ
- দুর্যোগ প্রস্তুতিতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের নিজস্ব ব্যয়: বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার
- বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতি: প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার
- পানি খাতে: প্রতি ১ ডলার অনুদানের বিপরীতে প্রায় ৭.৭৮ ডলার ঋণ
পরিবারগুলোর নিজস্ব খরচ কেন হিসাবের বাইরে
খানের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলো দুর্যোগ প্রস্তুতিতে প্রতিবছর প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে, অথচ প্রচলিত জলবায়ু অর্থায়ন কাঠামো এই ব্যয়কে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। বাকি ঘাটতি সরকার নিজস্ব বাজেট থেকে পূরণ করে।
তিনি বলেন, আগের ক্ষতি মেরামত শেষ হওয়ার আগেই বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের নতুন ক্ষতি আসে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০২৬-২৭ সালের এল নিনোর কথা বলেন। তাপপ্রবাহ, খরা, রোগবালাই ও মৎস্য খাতের চাপ একসঙ্গে আসছে, আর প্রতিটির সঙ্গে যোগ হচ্ছে বাড়তি খরচ। বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সরকারি অনুদানের দুর্বল প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও নাজুক ও ঋণফাঁদের ঝুঁকিতে ফেলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাকির হোসেন খান জলবায়ু অর্থায়নে কী দাবি তুলেছেন
‘শক্তি–দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ কপ৩১ ডায়ালগ সিরিজ’-এর অংশ হিসেবে সাক্ষাৎকারটি নেন দ্য ক্লাইমেট ওয়াচের নির্বাহী সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ। এতে খান যেসব প্রস্তাব দিয়েছেন:
- জলবায়ু অর্থায়নের একটি অভিন্ন সংজ্ঞা, যেখানে নতুন নামে চালানো সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) বাদ যাবে এবং ঋণের অভিহিত মূল্যের বদলে অনুদান-সমতুল্য মূল্যে অর্থের হিসাব দেওয়া হবে
- ২০৩০ সালের মধ্যে ইউএনএফসিসিসি থেকে অর্থের প্রবাহ ২০২২ সালের তিন গুণে উন্নীত করা, যা ‘গ্লাসগো ২০২৫ ফ্লোর’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে
- অভিযোজন এবং ক্ষয়ক্ষতি অর্থায়নের একটি ন্যূনতম সীমা
- ২০৩০ সালের অন্তর্বর্তী লক্ষ্যসহ একটি অভিযোজন অর্থায়ন পথরেখা
- অভিযোজন এবং ক্ষয়ক্ষতির অর্থায়ন শুধু অনুদান হিসেবে দেওয়া
- স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা নয়, ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী রেয়াতি ও অনুদান তহবিলে প্রবেশাধিকার
- মূল্যভিত্তিক একটি ব্লু কার্বন ও ব-দ্বীপ সংরক্ষণ সুবিধা, যার অন্তত ২০ শতাংশ যাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে
‘টিকে থাকার অর্থকে যেন ঋণ হিসেবে গণ্য করা না হয়, সে জন্য অভিযোজন এবং ক্ষয়ক্ষতি অর্থায়ন শুধু অনুদানে দিতে হবে,’ বলেন খান।
খান আরও বলেছেন, অ্যাডাপটেশন ফান্ডকে বছরে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। এই লক্ষ্যের ভিত্তি সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করা হয়নি। তিনি ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করেন এবং বলেন, এর পুনঃপূরণ হতে হবে চাহিদাভিত্তিক, শুধু অনুদানে এবং সরাসরি প্রবেশাধিকারসহ। তবে কোন তহবিলের কথা বলা হয়েছে, তা সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট নয়। ঝুঁকিভিত্তিক প্রবেশাধিকারের প্রস্তাবে তিনি ‘এনসিএসটি’ ব্যবহারের কথা বলেছেন, যার পূর্ণরূপও সেখানে দেওয়া হয়নি।
একই সুর উঠেছে ফিজির নাদিতে অনুষ্ঠিত প্রাক-কপ৩১ বৈঠকেও। ডেইলি স্টারের নিবন্ধ অনুযায়ী, মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাসিফিক অ্যাকশন ফর ক্লাইমেট ট্রানজিশনসের (প্যাক্ট) সহকর্মীদের সঙ্গে সেখানে অংশ নেন লেখক। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিরা স্পষ্ট বলেছেন, উষ্ণায়নে যাদের ভূমিকা সামান্য, তার পরিণতি সামলাতে তাদের নতুন করে ঋণ নিতে হওয়া উচিত নয়।
ঘূর্ণিঝড় আইলা খুলনার পরিবারগুলোর কী ক্ষতি করেছিল
ডেইলি স্টারের নিবন্ধের লেখক, যাঁর নাম প্রাপ্ত অংশে নেই, বেড়ে উঠেছেন খুলনায় সুন্দরবনের কাছে। তাঁর শৈশবের গ্রামগুলোতে পরে আঘাত হানে ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের আইলা। তিনি লিখেছেন, আইলার পর ভাঙা বাঁধ ও লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ঝড় থেমে যাওয়ার অনেক পরেও চাষাবাদ ও খাবার পানির সরবরাহ ব্যাহত করেছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের জলবায়ু ও উন্নয়ন প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে লেখক জানান, ১৯৭০ সালের পর বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়জনিত মৃত্যু শত গুণ কমেছে। এর কৃতিত্ব আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কব্যবস্থা ও স্বেচ্ছাসেবকদের। ‘তবু একটি পরিবার দুর্যোগ থেকে বেঁচে গিয়েও জীবিকা হারাতে পারে,’ লিখেছেন তিনি।
আইলাকবলিত পরিবারগুলো নিয়ে তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পরিবারের সামাজিক সম্পর্কের পরিসরে দুর্যোগের প্রভাব পরবর্তী আয় ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। আরেক গবেষণায় দেখা যায়, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগ্রহণকারীরা পরীক্ষামূলক ঝুঁকি ভাগাভাগির দল থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা কম দেখিয়েছেন।
তবে পারস্পরিক সহায়তা পুরো জনগোষ্ঠীর হারানো সম্পদের বিকল্প নয় বলে মনে করেন লেখক। ‘সরকারি সহায়তা অপরিহার্য, বিশেষ করে যেসব পরিবারের সামাজিক যোগাযোগ বা সহায়তার নেটওয়ার্ক সীমিত,’ লিখেছেন তিনি। তাঁর উদাহরণ, একজন কৃষিশ্রমিকের কোনো জমি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও তিনি কাজ হারাতে পারেন এবং ক্ষতিপূরণের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন।
আন্তালিয়ায় উন্নত দেশগুলো অনুদানভিত্তিক অভিযোজন এবং ক্ষয়ক্ষতি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেবে কি না, আর ভূমিহীন শ্রমিকদের কাছে ক্ষতিপূরণ কীভাবে পৌঁছাবে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।