ওয়াশিংটন, ৪ জুন ২০২৬ — যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর ইসরায়েল ও লেবানন একটি নতুন যুদ্ধবিরতি কাঠামোয় সম্মত হয়েছে। কয়েক মাস ধরে চলা সীমান্ত সংঘাত ও প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী, হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সব ধরনের হামলা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে এবং দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চল থেকে তাদের যোদ্ধা ও অবকাঠামো সরিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে কয়েকটি “পাইলট জোন” গঠন করা হবে, যেখানে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী এককভাবে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করবে এবং কোনো অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকবে না।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি বাহিনীও ধীরে ধীরে তাদের সামরিক উপস্থিতি কমাবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের বিষয়ে এখনও বিস্তারিত আলোচনা বাকি রয়েছে।
মার্চ মাসে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে এটি ছিল লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিদের মধ্যে চতুর্থ দফা আলোচনা। উভয় পক্ষ আগামী ২২ জুনের সপ্তাহে আবারও বৈঠকে বসবে, যেখানে একটি স্থায়ী ও বিস্তৃত সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।
তবে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ওয়াশিংটনের আলোচনায় হিজবুল্লাহ সরাসরি অংশ নেয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সংগঠনটি চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাইম কাসেম জানিয়েছেন, লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহার ছাড়া কোনো স্থায়ী সমঝোতা গ্রহণযোগ্য হবে না।
চুক্তি ঘোষণার দিনও উভয় পক্ষের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলা এবং উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর আক্রমণের খবর পাওয়া যায়। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরও উত্তর ইসরায়েলে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজে এবং লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে হামলার খবর আসে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, আপাতত লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে ইসরায়েল এবং প্রয়োজন হলে তারা হামলা চালানোর স্বাধীনতা বজায় রাখবে। অন্যদিকে লেবাননের সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের কারণে বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের এখনই দক্ষিণাঞ্চলে ফিরে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই আলোচনাকে “চূড়ান্ত সুযোগ” হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম জানিয়েছেন, চুক্তি বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হিসেবে লেবাননের সেনাবাহিনী প্রস্তাবিত পাইলট জোনগুলোতে মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে, ইরানও পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে। তেহরান বলেছে, লেবাননের পরিস্থিতি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে সংঘাত আবারও বিস্তৃত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতিটি এখনও অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ঘোষিত আগের যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি এবং উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছিল। ফলে নতুন এই চুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
তবুও কূটনীতিকরা এই চুক্তিকে সহিংসতা কমানোর এবং ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।