নিউইয়র্ক:
চার দিনব্যাপী বর্ণিল আয়োজন, সাহিত্যিকদের প্রাণবন্ত আড্ডা এবং বইপ্রেমীদের উপচে পড়া ভিড়ের মধ্য দিয়ে জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে পর্দা নামলো ৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার। গত সোমবার (২৫ মে) উৎসবমুখর পরিবেশে সমাপনী ঘোষণার মাধ্যমে শেষ হয় উত্তর আমেরিকার বুকে প্রবাসী বাঙালিদের এই বৃহত্তম সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। টানা দুই দিনের বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে শেষ দিনে বইপ্রেমী, লেখক ও প্রকাশকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ, যা প্রমাণ করে ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে প্রবাসেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত।
গত ২২ মে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলনের উদ্বোধনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল চার দিনব্যাপী এই সাহিত্য উৎসব। মেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। উদ্বোধনী পর্বেই রওনক জাহান, ফরিদুর রেজা সাগর, সুবোধ সরকার, দীপেন ভট্টাচার্য, তৌফিক ইমরোজ খালিদী, ফারুক মঈনউদ্দীন, সাদাত হোসাইন এবং বব হোলম্যানসহ দেশ-বিদেশের বহু বরেণ্য লেখক ও গবেষকের উপস্থিতি পুরো আয়োজনে এক আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করে। প্রথম দিনেই মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বজিৎ সাহাকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন এবং নজরকাড়া সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
বৃষ্টি উপেক্ষা করে পাঠকদের জোয়ার ও সাহিত্য আড্ডা
মেলার দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে নিউইয়র্ক জুড়ে টানা বৃষ্টিপাত হলেও মেলার উদ্দীপনায় কোনো বাটা পড়েনি। "গদ্যের অন্দরমহল" শীর্ষক আকর্ষক লেখক-পাঠক আড্ডায় সমকালীন সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন ইমদাদুল হক মিলন, সাদাত হোসাইন, দীপেন ভট্টাচার্য, ফেরদৌস সাজেদীন ও বিরূপাক্ষ পালসহ অন্যান্য গুণীজনেরা। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নাটক "রক্তকরবী"র মঞ্চায়ন এবং প্রখ্যাত শিল্পী অদিতি মহসিনের একক সংগীতানুষ্ঠান ছিল মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। প্রকাশকদের মতে, শেষ দিনে রোদ ঝলমলে আবহাওয়ায় বই বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যেখানে নতুন বই, গবেষণাগ্রন্থ ও শিশুতোষ বইয়ের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি।
মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য पुरस्कार অর্জন করলেন ড. আব্দুন নূর
মেলার তৃতীয় দিনে ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ 'মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার' ঘোষণা করা হয়। এবার এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ঔপন্যাসিক ড. আব্দুন নূর। পুরস্কারের প্রবর্তক গোলাম ফারুক ভূঁইয়া বিজয়ীর নাম ঘোষণা করতে গিয়ে পূর্ববর্তী কবি ও সাহিত্যিকদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। পুরস্কার হিসেবে ড. আব্দুন নূরের হাতে ক্রেস্ট ও ৩ হাজার মার্কিন ডলার তুলে দেওয়া হয়। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, "বাংলাদেশে থাকতেই সাহিত্যচর্চা শুরু করি। অনেক সময় নিজের মানুষের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন হয়। আজকের এই সম্মান আমাকে গভীরভাবে আপ্লুত করেছে।" এছাড়া সমাপনী দিনে প্রকাশনা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য 'বাতিঘর' প্রকাশনীকে 'চিত্তরঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার' প্রদান করা হয়।
নতুন প্রজন্ম ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন: এআই এবং তরুণদের উৎসব
এবারের বইমেলার একটি বিশেষ দিক ছিল নতুন প্রজন্মের বিপুল অংশগ্রহণ। শিশু-কিশোরদের জন্য আয়োজিত চিত্রাঙ্কন ও বাংলা লিখন প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি, শহীদ মিনার ও জাতীয় স্মৃতিসৌধ। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে "সৃজনশীলতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)" শীর্ষক একটি ব্যতিক্রমী সেমিনার। শতাধিক টিনএজার ও তরুণ এই আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রযুক্তির যুগে মানবিক বোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে মতবিনিময় করেন। বক্তাদের মতে, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক না কেন, নিজের শিকড়কে ভুলে না যাওয়াই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মেলার সমাপনী পর্বে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন, জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে আলোচনা এবং কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনের মুখোমুখি একক আড্ডা দর্শকদের মাঝে বিপুল সাড়া ফেলে। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "দেখতে দেখতে ৩৫ বছর পার হয়ে গেল। নিউইয়র্ক বইমেলা আজ শুধু একটি আয়োজন নয়, এটি প্রবাসী বাঙালির এক যৌবনের অহংকার।" ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও মেলার আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম পর্দার আড়ালের স্বেচ্ছাসেবক ও গণমাধ্যমের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
অনুষ্ঠান শেষে ঘোষণা করা হয় যে, আগামী ২০২৭ সালের ২১ থেকে ২৪ মে অনুষ্ঠিত হবে ৩৬তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা। এর মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হলো—বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়, বরং তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির হৃদয়ের এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন।