ঢাকা, ১৪ জুন ২০২৬ — একসময় দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে পরিচিত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সাবেক এই পুলিশ প্রধানের জীবনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদ এখন আন্তর্জাতিকভাবে পলাতক এক আসামি হিসেবে পরিচিত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে গত ১২ জুন দুবাই পুলিশ বেনজীর আহমেদকে আটক করে। সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছে এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
দুদক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দায়ের করা একাধিক মামলায় তাকে খোঁজা হচ্ছিল। এসব মামলায় ইন্টারপোলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছিল।
১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন বেনজীর আহমেদ। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ২০২০ সালে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে অধিষ্ঠিত হন।
কর্মজীবনে তিনি একাধিক পদক ও পুরস্কারে ভূষিত হন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশাসনের একজন আস্থাভাজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
২০২৪ সালে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিপুল সম্পদের বিষয়টি জনসমক্ষে আসে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তাদের অর্জিত সম্পদের পরিমাণ ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এরপরই দুদক আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে।
পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের নামে থাকা শত শত বিঘা জমি, ব্যাংক হিসাব, শেয়ার এবং অন্যান্য সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করা হয়। বিদেশে থাকা সম্ভাব্য সম্পদের খোঁজেও তদন্ত শুরু হয়।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৭৬ কোটি টাকার অস্বাভাবিক সম্পদের উৎস নিয়ে তদন্ত চলছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে দায়ের করা মামলায় তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, তথ্য গোপন এবং অর্থপাচারের অভিযোগ আনা হয়।
তদন্ত শুরু হওয়ার পর ২০২৪ সালের মে মাসে বেনজীর আহমেদ দেশ ত্যাগ করেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরও কীভাবে তিনি দেশ ছেড়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন, সে বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সমালোচকদের মতে, এ ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং রাষ্ট্রের নজরদারি ও জবাবদিহি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি র্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালে গুম এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে কার্যক্রম চলছে। তবে এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন বেনজীর আহমেদ এবং এখনো কোনো মামলায় চূড়ান্ত রায় হয়নি।
২০২১ সালে র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি আইনের আওতায় বেনজীর আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। তিনিও সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কূটনৈতিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নির্ধারিত হবে। সরকার আশা প্রকাশ করেছে যে, খুব শিগগিরই তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে।
বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে অনেকে এটিকে আইনের শাসনের বিজয় হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন— বছরের পর বছর ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কেন আগে কার্যকরভাবে তদন্ত করা হয়নি।
একসময়ের প্রভাবশালী পুলিশ প্রধান এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায়। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তিই নির্ধারণ করবে, ইতিহাস তাকে কীভাবে স্মরণ করবে।