মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে 'হোক্স' বলে দাবি করে এই প্রযুক্তির ওপর বাড়তি নিয়ন্ত্রণ আরোপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। সোমবার একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তিনি এই মন্তব্য করেন, জানিয়েছে বিবিসি।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময় এলো, যখন এআই কোম্পানি অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা থেকে শুরু করে বার্নি স্যান্ডার্স ও স্টিভ ব্যাননের মতো রাজনীতির বিপরীত পক্ষের ব্যক্তিত্বরা বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি তুলছেন। যুক্তরাষ্ট্র-চীন এআই প্রতিযোগিতার জেরে নিরাপত্তা বিধি টিকবে কি না, সেই বৈশ্বিক বিতর্কও তুঙ্গে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প এআই-সংক্রান্ত সতর্কতার তুলনা করেছেন 'গ্লোবাল ওয়ারমিং স্ক্যাম' এবং 'রাশিয়া, রাশিয়া, রাশিয়া হোক্স'-এর সঙ্গে, আর নিজেকে বলেছেন 'দ্য হোক্স বাস্টার'। তাঁর মতে, এআই-এর জন্য একমাত্র প্রয়োজনীয় 'গার্ডরেল' হলো একজন 'শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান' প্রেসিডেন্ট।
এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, "এআই এবং ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে একটি রোগগ্রস্ত ষড়যন্ত্র চলছে, এবং এর একমাত্র খুশি হওয়া পক্ষ হলো চীন। যে এআই জিতবে, সে-ই জিতবে!"
এআই কিল সুইচ অ্যানথ্রোপিক: বন্ধ করার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকের প্রস্তাব
অ্যানথ্রোপিকের সাত সহ-প্রতিষ্ঠাতার একজন জ্যাক ক্লার্ক বিবিসিকে বলেছেন, এআই সফটওয়্যার অতিরিক্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠলে তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পদ্ধতি — 'কিল সুইচ' — শিল্পখাতের জন্য বাধ্যতামূলক করা দরকার হতে পারে এবং তা তৃতীয় কোনো পক্ষ যাচাই করতে পারবে এমন হতে হবে। তাঁর কথায়, অ্যানথ্রোপিকসহ বেশিরভাগ ল্যাবের নিজস্বভাবে 'প্লাগ টানার' ব্যবস্থা আছে, তবে আইনপ্রণেতাদের তা বাধ্যতামূলক করতে হতে পারে।
ক্লার্কের মন্তব্যের আগে কয়েক দিন ধরে শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহী ও কর্মীদের কাছ থেকে ঝুঁকি নিয়ে একের পর এক সতর্কতা আসছিল। এর মধ্যে অ্যানথ্রোপিক ছেড়ে যাওয়া গবেষক জ্যাকব কক্সনের একটি পোস্ট ভাইরাল হয়; তিনি আশঙ্কা করেন এআই মানবজাতির বিলোপ ঘটাতে পারে। অ্যানথ্রোপিকের বিজ্ঞানী ইভান হাবিনজার বলেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআই-এর কারণে মানব বিলুপ্তির সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি বলে তিনি মনে করেন।
অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এআই উন্নয়নের গতি কমানো ও কঠোর নজরদারির পক্ষে মত দিয়েছেন, যদিও বলেছেন যেকোনো পদক্ষেপ নিতে হবে "বাণিজ্যিক সুবিধা ত্যাগ না করে"। বিবিসি জানায়, তাঁর এই আহ্বানের উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। আমাদের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যান ও xAI-এর ইলন মাস্কও শিল্প পর্যায়ে উন্নয়ন ধীর করা ও স্বাধীন তত্ত্বাবধানের পক্ষে মত দিয়েছেন।
এআই ঝুঁকি সতর্কতায় টেক শেয়ার পতন
এই সতর্কতার প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে। বিবিসি জানায়, এআই উন্নয়ন ধীর হতে পারে — এই আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ার বিক্রি শুরু করেছেন।
ব্রিটেনের ব্যবসা সচিব জোনাথন রেনল্ডস মঙ্গলবার বিবিসিকে বলেছেন, এআই-এর প্রভাব নিয়ে কখনো 'উদাসীন' হওয়া যাবে না, তবে অতিরঞ্জনও ঠিক নয়। তিনি বলেন, "অবশ্যই ঝুঁকি আছে, তবে স্পষ্টভাবে বলি, বিশাল সম্ভাবনাও আছে — জনসেবা, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতিতে অবদান।"
এই বিতর্কের মধ্যেই মাইক্রোসফট এআই 'হিউম্যানিস্ট এআই' নামে নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মুস্তাফা সুলেমান সিএনবিসিকে জানান, এটি কয়েক মাস ধরে তৈরি করা হচ্ছিল; চলতি বিতর্কের কারণেই এখন প্রকাশ করা হলো।
স্যান্ডার্স-ব্যানন এক মঞ্চে, চীনকে টার্গেট ট্রাম্পের বক্তব্যে
মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে 'প্রো-হিউম্যান অ্যাসেম্বলি' নামের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল ট্রাম্পের সাবেক প্রধান কৌশলী স্টিভ ব্যানন ও প্রগতিশীল সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের। আয়োজকদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এই সমাবেশের লক্ষ্য "এআই উন্নয়নের জন্য আরও মানবকেন্দ্রিক পথের ভাগ করা দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করা"।
স্যান্ডার্স গত সপ্তাহে বিবিসি নিউজনাইটকে বলেছিলেন, "এআই-এর অনিয়ন্ত্রিত প্রবৃদ্ধি বন্ধে আমাদের এখনই কিছু করতে হবে।" তাঁর ভাষায়, "মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অস্তিত্বগত হুমকি রয়েছে।"
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসকে ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক জিন চিয়াং বলেছেন, চীনের দ্রুত এআই অগ্রগতি নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অগ্রাধিকারকে বিকৃত করছে। তিনি বলেন, "তারা জানে চীন এআই-তে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে, আর আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র উন্নয়ন ধীর করলে বা নিয়ন্ত্রণ কঠোর করলে চীন আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।"
এখন দেখার বিষয়, কিল সুইচ বাধ্যতামূলক করতে মার্কিন আইনপ্রণেতারা এগোয় কি না, প্রো-হিউম্যান অ্যাসেম্বলি থেকে কী আসে এবং ট্রাম্প প্রশাসন এআই-তে আনুষ্ঠানিক কোনো নিয়ন্ত্রণ-শিথিল পদক্ষেপ নেয় কি না।