মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) ও সাতটি অঙ্গরাজ্য মঙ্গলবার ম্যানহাটনের এক ফেডারেল বিচারকের কাছে মার্টিন শক্রেলিকে আদালত অবমাননায় দোষী ঘোষণার আবেদন করেছেন। অভিযোগ, ২০২২ সালের সেই দেওয়ানি আদেশ তিনি "চরমভাবে ও বারবার লঙ্ঘন করেছেন", যেখানে ওষুধ শিল্প থেকে তাঁকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
সিএনবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের মে মাসে কারাগার থেকে মুক্তির পর শক্রেলি প্রকাশ্যে অন্তত ৬০টি ওষুধ কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করেছেন এবং ইউটিউব, এক্স ও রেডিটসহ নানা সামাজিক মাধ্যমে লাইভস্ট্রিম ও পোস্টের মাধ্যমে ওষুধ কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতামত প্রচার করেছেন।
মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পরীক্ষা করবে আদালত-আরোপিত শিল্পখাত নিষেধাজ্ঞা আদৌ কার্যকর করা যায় কি না। এফটিসি কমিশনার মার্ক মিডর এক বিবৃতিতে বলেন, "আজীবন শিল্প নিষেধাজ্ঞা তখনই কার্যকর, যখন এর লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আদেশের গুরুত্ব অনুপাতে পরিণতি নিশ্চিত করা হয়।"
মার্টিন শক্রেলি এখন কী করছেন
আর্স টেকনিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবেদনে শক্রেলির অভিযুক্ত লঙ্ঘনগুলোকে চারটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে।
- ২০২২ সালে আরেক ইউটিউবারের সঙ্গে শেয়ার ট্রেডিং প্রতিযোগিতা;
- ২০২৪ সালে একটি ছোট বায়োটেক কোম্পানির শেয়ার শর্ট করা ও অন্যান্য ওষুধ কোম্পানির শেয়ারে লেনদেন;
- ২০২৫ সালে তিনটি ছোট বায়োটেক কোম্পানি শর্ট করাসহ ট্রেডিং চ্যালেঞ্জ;
- ২০২৬ সালের জুনে ১০,০০০,০০০ ডলারের অ্যাকাউন্ট নিয়ে আরেকটি ট্রেডিং চ্যালেঞ্জ শুরু।
লাইভস্ট্রিমে মাঝে মাঝে তিনি নিজের অ্যাকাউন্ট পর্দায় দেখাতেন, ওষুধ কোম্পানির শেয়ার মূল্যায়ন করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতেন—আবেদনে এসব বলা হয়েছে। ২০২৫ সালের এক লাইভস্ট্রিমে তিনি বলেন, "আমি কোন ট্রেড করি তা বিষয় নয়, কারণ আমি সবসময় কয়েকটি বায়োটেক শেয়ার পেয়ে যাই ধ্বংস করার জন্য।" একই বছর দর্শকদের একটি ওষুধ কোম্পানির শেয়ার শর্ট করার পরামর্শ দেওয়ার পর ওই কোম্পানির শেয়ারের দাম দ্রুত ১৭ শতাংশ কমে যায়।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, "আমার আরও কিছু অ্যাকাউন্ট আছে যা তোমাদের দেখাতাম, কিন্তু জানি ফেডরা দেখছে, তাই সেটা বাদ।" এফটিসি ও অঙ্গরাজ্যগুলো বলেছে, শনাক্ত হওয়া শেয়ারগুলো "সম্ভবত হিমশৈলের চূড়া মাত্র", কারণ এফটিসি কর্মীরা তাঁর সামাজিক মাধ্যম কার্যক্রমের ক্ষুদ্র অংশই পর্যালোচনা করেছেন।
কী শাস্তি চাওয়া হচ্ছে
আবেদনে বিচারকের কাছে চাওয়া হয়েছে, শক্রেলির মালিকানাধীন সব ওষুধ কোম্পানির শেয়ার বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হোক এবং লেনদেনের মুনাফার সমান জরিমানা (বিচার-পূর্ব সুদসহ) আদায় করা হোক, যেখানে লোকসান সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে না। সিএনবিসি জানায়, ভবিষ্যতের লঙ্ঘনের জন্য "স্পষ্ট ও ধাপে ধাপে বাড়তে থাকা পরিণতি"—আর্থিক জরিমানা ও সম্ভাব্য কারাদণ্ড—নির্ধারণের অনুরোধও করা হয়েছে।
এ ছাড়া শক্রেলির বোন লিওনোরা আইজার্ন ও তাঁর সঙ্গী চেলসি ভসকে প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ চাওয়া হয়েছে; আবেদনে বলা হয়েছে, দুজনই "শক্রেলিকে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনে সহায়তা করেছেন বা করছেন বলে মনে হচ্ছে।"
ডারাপ্রিম দাম বৃদ্ধি থেকে আজীবন নিষেধাজ্ঞা
শক্রেলি কুখ্যাতি পান ভায়েরা ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রতিপরজীবীবিরোধী ওষুধ ডারাপ্রিমের দাম প্রায় এক রাতের মধ্যে ১৭.৫০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ ডলার করে দেওয়ার মাধ্যমে, পাশাপাশি জেনেরিক প্রতিযোগীদের বাজারে ঢুকতে বাধা দিয়ে। ২০২০ সালে এই কারসাজির বিরুদ্ধে একই সাতটি অঙ্গরাজ্য—নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয়, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, পেনসিলভেনিয়া ও ভার্জিনিয়া—এফটিসির সঙ্গে মামলা করেছিল।
২০২২ সালে ফেডারেল আদালত রায় দেয় যে "শক্রেলির চরম, ইচ্ছাকৃত, পুনরাবৃত, দীর্ঘমেয়াদি এবং চরমভাবে বিপজ্জনক বেআইনি আচরণ" এই পরিসরের নিষেধাজ্ঞার যোগ্য। নিষেধাজ্ঞায় স্পষ্টভাবে ওষুধ কোম্পানির শেয়ারের মালিকানা এবং কোনো ওষুধ কোম্পানির ব্যবসায় প্রভাব ফেলতে পারে এমন প্রকাশ্য বক্তব্য—উভয়ই নিষিদ্ধ করা হয়। একই রায়ে ৬৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। দ্বিতীয় সার্কিট আপিল আদালত ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখেন এবং সুপ্রিম কোর্ট সেই বছরের অক্টোবরে তাঁর আপিল শুনতে অস্বীকৃতি জানায়।
এফটিসির প্রতিযোগিতা বিভাগের পরিচালক ড্যানিয়েল গুয়ার্নেরা বলেন, "পূর্ণ বিচারের পর আদালত দেখেছে, মার্টিন শক্রেলির আচরণ আমেরিকান রোগীদের প্রেসক্রিপশন ওষুধের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সস্তা জেনেরিক ওষুধের বাজারে আসার পথ বন্ধ করেছে।"
কেন গিয়েছিলেন কারাগারে
এই দেওয়ানি মামলার সঙ্গে শক্রেলির ফৌজদারি মামলার সম্পর্ক নেই। ২০১৭ সালে তিনি পরিচালিত হেজফান্ড ও প্রতিষ্ঠিত আরেকটি ওষুধ কোম্পানি সংক্রান্ত সিকিউরিটিজ জালিয়াতিতে দোষী সাব্যস্ত হন, ২০১৮ সালে সাত বছরের কারাদণ্ড পান এবং ২০২২ সালের মে মাসে মুক্তি পান।
আবেদনের প্রতিক্রিয়ায় শক্রেলি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, "স্বৈরাচারী নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেতিশিয়া জেমসের কাছ থেকে একজন নাগরিকের বাকস্বাধীনতা সীমিত করার চেষ্টা আশা করতে পারি, কিন্তু ট্রাম্পের এফটিসির কাছ থেকে নয়।" প্রকাশের সময় পর্যন্ত শক্রেলির আইনজীবী মন্তব্য করেননি, জানিয়েছে সিএনবিসি।
এখন দেখার বিষয়, বিচারক শক্রেলিকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী করেন কি না এবং দোষী হলে জরিমানা, শেয়ার বিক্রি নাকি কারাদণ্ড—কোন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে।