নতুন দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনে মন্ত্রী (প্রেস) হিসেবে ১৪ মাস কাজ করা সাবেক কূটনীতিকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের প্রশংসিত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি 'শীর্ষ-ভিত্তিক'—বড় জিডিপি সংখ্যা আছে, কিন্তু গণ কর্মসংস্থান নেই। দ্য ডেইলি স্টারে (thedailystar.net) প্রকাশিত ওই বিশ্লেষণে তিনি সতর্ক করেছেন, পোশাক রপ্তানির সাফল্য সত্ত্বেও শ্রম-সঘন শিল্পে বিবিধীকরণ না করলে বাংলাদেশও একই ফাঁদে পড়তে পারে।
লেখকের পর্যবেক্ষণের ভিত্তি কেবল সংখ্যা নয়। অফিসিয়াল কাজ ও ব্যক্তিগত ভ্রমণে তিনি ঘুরে দেখেছেন উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, রাজস্থান, পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্র প্রদেশ ও হিমাচল প্রদেশ। দিল্লিতে কূটনীতিক মহল ও ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা, সংবাদপত্র পাঠ এবং সাধারণ নাগরিকদের অর্থনৈতিক জীবন পর্যবেক্ষণ থেকে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে।
ভারত এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি—আউটপুট চার ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, বৃদ্ধির হার প্রায়ই ৬ থেকে ৮ শতাংশ। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে মহাকাশযান অবতরণ করেছে, শেয়ারবাজার উর্ধ্বমুখী। পশ্চিমা রাজধানীগুলো ভারতকে চীনের বিপক্ষে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য হিসেবে দেখছে। এসবের কোনোটিই মিথ্যা নয়, কিন্তু লেখকের ভাষায়, "এটি এমন একটি দেশ, যেখানে ব্যাপ্তি আছে কিন্তু বিস্তার নেই, সম্পদ আছে কিন্তু ছড়িয়ে পড়া নেই।" তাঁর মতে, "ভারতের বৃদ্ধি মডেল শীর্ষ-ভিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
কেন ভারতের বৃদ্ধিকে বলা হচ্ছে 'বেকারমুক্ত বৃদ্ধি'
প্রতি বছর প্রায় ১০–১২ মিলিয়ন তরুণ ভারতীয় কর্মশক্তিতে যুক্ত হচ্ছেন—বেলজিয়ামের সমান একটি দেশকে প্রতি বছর শ্রমবাজারে যোগ করার মতো। সফটওয়্যার পার্ক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা উচ্চমানের সেবা খাত দিয়ে এত বড় কর্মশক্তি শোষণ সম্ভব নয়। দরকার কারখানা, গুদাম, নির্মাণ সরবরাহ শৃঙ্খলা ও হাজার হাজার মানুষ নিয়োগ দিতে পারা মাঝারি উদ্যোগ—যা ভারত যথেষ্ট তৈরি করতে পারেনি।
আধিকারিক ও বেসরকারি পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকলেও বড় চিত্র স্পষ্ট: শহরাঞ্চলে যুব বেকারত্ব প্রায়ই মাঝারি থেকে উচ্চ কিশোর হারে (mid-to-high teens) রয়েছে, কিছু অঞ্চলে নারী যুব বেকারত্ব নাটকীয়ভাবে বেশি। এর ওপরে রয়েছে প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব—একজনের কাজে পরিবারের কয়েকজন লেগে আছেন; তারা কর্মসংস্থিত হিসেবে গণ্য হচ্ছেন, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে এগোচ্ছেন না।
নিম্নপদের সরকারি চাকরিতে আবেদনের ঢল এই সংকটের প্রমাণ:
- ২০২২ সালে ভারতীয় রেলওয়ে প্রায় ৩৫ হাজার পদ ঘোষণা করলে আবেদন আসে ১২ মিলিয়নের বেশি—প্রতি পদে প্রায় ৩৫৭ জন প্রার্থী। পরীক্ষার নিয়ম বদলালে বিহারসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ হয়।
- ২০২৪ সালে উত্তর প্রদেশে মাত্র ৬২টি চাপরাসির পদে আবেদন করেন ৯৩ হাজারের বেশি মানুষ—যাদের মধ্যে স্নাতক, প্রকৌশলী ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীও ছিলেন।
লেখকের পর্যবেক্ষণ, "যখন উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা এই সংখ্যায় বার্তাবাহক-পর্যায়ের কাজের জন্য প্রতিযোগিতা করে, তখন জিডিপির শিরোনাম আর ততটা বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।" অর্থনীতিবিদরা এই ধরনকে 'বেকারমুক্ত বৃদ্ধি' বলেন—আউটপুট বাড়ছে, কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
মেক ইন ইন্ডিয়া লক্ষ্য কতটা পূরণ হলো
২০১৪ সালে চালু হওয়া 'মেক ইন ইন্ডিয়া' অভিযানের লক্ষ্য ছিল উৎপাদন খাতের জিডিপিতে অংশ ১৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে তোলা। এক দশক পর তা লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে; কিছু মাপকাঠিতে বরং ১৩–১৪ শতাংশে নেমে এসেছে। 'চাইনা প্লাস ওয়ান' কৌশলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ভিয়েতনাম, মেক্সিকো ও বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকেছে, ভারতের দিকে নয়।
ইতিহাস অন্য পথের কথা বলে। ব্রিটেন, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও চীন—সবাই আগে শিল্পায়ন করেছে; গ্রামের শ্রম কারখানায় গেছে, তারপর গড়ে উঠেছে গণ মধ্যবিত্ত। ভিয়েতনাম এখন সেই পথেই হাঁটছে। ভারত শিল্পায়ন সম্পন্ন হওয়ার আগেই সেবা-প্রধান অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে শ্রম-সঘন উৎপাদনের ধাপটিই এড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ও বিবিধীকরণের বার্তা
বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে শ্রম-সঘন শিল্পায়নের আংশিক সাফল্য পেয়েছে—রপ্তানি ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কিন্তু লেখকের যুক্তি, বিবিধীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণমূলক সহজতর নিশ্চিত না করলে বাংলাদেশও শীর্ষ-ভিত্তিক বৃদ্ধির জালে আটকে পড়তে পারে।
ভারতের শিল্পায়নের বাধাগুলোই বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা: জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, বন্দর ও লজিস্টিক্স খরচ, দীর্ঘমেয়াদি আদালতি মামলা এবং ৬৯ হাজারের বেশি কমপ্লায়েন্স চাহিদা। অর্থনৈতিক বৃদ্ধির আকার বড় করলেই হবে না—তা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই, সেটিই মূল প্রশ্ন বলে মনে করেন লেখক।
ভারতীয় বা বাংলাদেশি নীতিনির্ধারকেরা এই সমালোচনায় কী সাড়া দিয়েছেন বা 'মেক ইন ইন্ডিয়া'র লক্ষ্য সংশোধন হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো জানা যায়নি।