কোল্টস নেক, নিউ জার্সি | ৯ মে, ২০২৬ – বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ নিউ জার্সি (BANJ) অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে তাদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘প্রবাসে বর্ষবরণ ২০২৬’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। শনিবার, ৯ মে নিউ জার্সির কোল্টস নেক হাই স্কুল প্রাঙ্গণ রূপ নিয়েছিল বাঙালি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক রঙিন মিলনমেলায়। বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে গান, নাচ এবং ঐতিহ্যবাহী উৎসবের টানে সমবেত হয়েছিলেন প্রবাসী বাঙালি পরিবার ও কমিউনিটির সদস্যরা।
দুপুর ২টো থেকে শুরু হয় বৈশাখী মেলা। এরপর সন্ধ্যা ৬টায় ঐতিহ্যবাহী ‘মঙ্গল যাত্রা’-র মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়, যেখানে ছিল সরাসরি পরিবেশনা। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক রীনা আমানুল্লাহ এবং স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন সভাপতি ফয়জুর রহমান।
পুরো সন্ধ্যাটি সাজানো ছিল বাংলাদেশের সমৃদ্ধ শিল্প সংস্কৃতির নানা বৈচিত্র্যময় পরিবেশনায়:
• শিশু ও সমবেত পরিবেশনা: ১৪টি মাইক্রোফোনের এক বিশাল সমন্বয়ে শিশুদের অনুষ্ঠানটি মঞ্চে দারুণ প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এছাড়া BANJ কোরাস দলের ২০ জন কণ্ঠশিল্পী, হারমোনিয়াম ও তবলার সংগত এক শক্তিশালী সমবেত পরিবেশনা উপহার দেন।
• একক পরিবেশনা: কণ্ঠশিল্পী ফারশাদ ও তানজিলার আধুনিক এবং লোকজ গানের সমন্বয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। এছাড়া আমান্ডা, নাশিতা এবং সুবর্ণা খান তাদের একক নৃত্যের মাধ্যমে ছান্দিক গল্পগাঁথা তুলে ধরেন।
• “রঙ্গিনী”: অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান তরুণ শিল্পীদের পরিবেশিত মনোমুগ্ধকর নৃত্য ‘রঙ্গিনী’। তাদের প্রাণবন্ত এবং স্বতঃস্ফূর্ত নাচের মুদ্রা পুরো আয়োজনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে এবং দর্শকদের উৎসাহিত করে তোলে। এই পরিবেশনায় অংশ নিয়েছিলেন নাশিতা আজম, বারিশা আলী, সারিনা রহমান, মেলিসা আলী, লামিসা প্রভা এবং আয়েশা মামুন; যাদের আবেগ এবং আত্মবিশ্বাস দর্শকদের কাছ থেকে প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছে। স্মরণীয় এই নৃত্যশৈলীটির চমৎকার কোরিওগ্রাফি করেছেন নাশিতা, সারিনা এবং লামিসা, যা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সৃজনশীলতা এবং নিষ্ঠার এক অনন্য প্রতিফলন।
• সৃষ্টি একাডেমি: স্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘সৃষ্টি একাডেমি’-র নৃত্যশিল্পীরা তাদের রঙিন পোশাক এবং সুনিপুণ ছন্দের মাধ্যমে মঞ্চ মাতান, যা নতুন প্রজন্মের মাঝে বাঙালি সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার এক অনন্য প্রয়াস ছিল।
অনুষ্ঠানের অন্যতম চমৎকার অংশ ছিল ঐতিহ্যবাহী ‘পিঠা উৎসব’। এখানে পাটিসাপটা, পুলি পিঠা, ভাপা পিঠা এবং চিতই পিঠাসহ নানা ধরনের হাতে তৈরি দেশি পিঠা প্রদর্শন করা হয়। পিঠার সুঘ্রাণ আর নান্দনিক পরিবেশনা প্রবাসের বুকে বাংলার চিরচেনা গ্রাম্য ঐতিহ্যের স্বাদ এনে দেয়।
সাংস্কৃতিক পর্বে বড়দের সমবেত সংগীতের পাশাপাশি ড. ফারুক আজম একটি চমৎকার ‘ধারা বর্ণনা’ উপস্থাপন করেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে তার আবৃত্তি ও কাব্যিক বর্ণনা পুরো পরিবেশনাটিতে এক গভীর আবেগ ও ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
পরিবেশনার বাইরেও এই আয়োজনটি প্রবাসী বাঙালিদের জন্য একে অপরের সাথে যুক্ত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। BANJ-এর কার্যনির্বাহী পর্ষদ উপস্থিত অতিথিদের সাথে মতবিনিময় করেন। এছাড়া আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘স্পন্সরদের সাথে পরিচিতি’, যেখানে স্থানীয় সেই সকল মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয় যাদের সহযোগিতায় এত বড় পরিসরে সংস্কৃতিকে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
BANJ-এর সভাপতি ফয়জুর রহমান বলেন, “প্রবাসে বর্ষবরণ কেবল একটি উৎসব নয়; এটি একটি সেতু যা আমাদের শেকড়ের সাথে সংযুক্ত রাখে এবং বৃহত্তর কমিউনিটির কাছে আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়।”
রাত ১০টায় ড. ফারুক আজম অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ, প্রখ্যাত শিল্পী রন্টি দাস-কে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান। ড. আজম ২০০২ সালে বিটিভির ‘নতুন কুঁড়ি’ থেকে শুরু করে ২০০৬ সালে ‘ক্লোজ আপ ওয়ান’-এ দ্বিতীয় রানার-আপ হওয়ার দীর্ঘ যাত্রার কথা তুলে ধরেন।
জনপ্রিয় প্লেব্যাক সিঙ্গার রন্টি দাস তার রান্নার শখ নিয়ে দর্শকদের সাথে হাস্যরসে মেতে ওঠেন। তবে দর্শকরা একবাক্যে একমত হন যে, রন্টি যদি মঞ্চ ছেড়ে রান্নাঘরকেই বেছে নিতেন, তবে কমিউনিটি তার সুরের অপূর্ব ‘স্বাদ’ থেকে বঞ্চিত হতো। তার চমৎকার সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমেই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
রীনা আমানুল্লাহর সমাপনী বক্তব্য এবং বিশেষ পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। নিউ জার্সিতে বসবাসরত বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির সহায়তায় এবং বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে BANJ সারা বছর জুড়েই এমন নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখে।