নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ২১ মে ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার ৮ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারের শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার রাতে তিনি পল্লবীতে নিহত রামিসার বাসায় যান এবং পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন।
এই পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। প্রধানমন্ত্রীর এই আকস্মিক আগমন এবং গভীর সমবেদনা প্রকাশে পুরো এলাকায় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
আজ রাতে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ পল্লবীতে রামিসার পরিবারের ভাড়া বাসায় পৌঁছান। তারা রামিসার পিতা-মাতা ও স্বজনদের বুকে টেনে নেন। ফুটফুটে শিশু রামিসাকে হারিয়ে দিশেহারা বাবা-মায়ের কান্নায় এ সময় চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দীর্ঘ সময় তাদের সাথে কথা বলেন এবং গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন।
পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন:
"সন্তান হারানোর এই বেদনা ও কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। একজন পিতা হিসেবে আমি আপনাদের এই অপরিসীম কষ্ট অনুভব করতে পারছি। এই কঠিন সময়ে পুরো দেশ ও আমাদের সরকার আপনাদের পাশে রয়েছে।"
তদন্তকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মে ২০২৬ (মঙ্গলবার) সকালে রাজধানীর পল্লবী থানার অন্তর্গত মিরপুর–১১ নম্বরের 'বি' ব্লকের একটি আবাসিক ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে এই নৃশংস ঘটনা ঘটে।
ঘটনার দিন সকালে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তার মা। কিন্তু হুট করেই রামিসাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্তানকে না পেয়ে মা চারদিকে দিশেহারা হয়ে খুঁজতে শুরু করেন। ওই ভবনের তৃতীয় তলায় মাত্র দুটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে—যার একটিতে রামিসার পরিবার এবং অন্যটিতে ভাড়া থাকত মাদকাসক্ত সোহেল রানা (৩০)।
তন্নতন্ন করে খোঁজার একপর্যায়ে মায়ের চোখ পড়ে পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে পড়ে থাকা একটি পরিত্যক্ত স্যান্ডেলের দিকে, যা ছিল রামিসার। এতে মায়ের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে এবং তিনি বারবার ওই ফ্ল্যাটের দরজা ধাক্কাতে থাকেন। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ সাড়া না দেওয়ায় এবং দরজা না খোলায়, তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে দরজার লক ভাঙার চেষ্টা করে। এ সময় দরজার ছিদ্রে (পিপহোল) চোখ রেখে ভেতরে এক নারীকে অস্থিরভাবে এদিক-ওদিক পায়চারি করতে দেখা যায়। পরবর্তীতে পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে বাথরুম থেকে রামিসার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে। তবে ততক্ষণে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা বাথরুমের গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। মূলত স্বামীকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করার জন্যই তার স্ত্রী ভেতর থেকে দরজা খোলেননি।
পরবর্তীতে পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে ঘাতক সোহেল রানা জানায়, সকালে দুই ফ্ল্যাটের মাঝখানের ফাঁকা জায়গা থেকে সে রামিসাকে জোরপূর্বক টেনে নিজের ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে নেয়। এরপর শিশুটিকে নির্মমভাবে ধর্ষণের পর বাথরুমে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
অপরাধীর কোনো ছাড় নেই: প্রধানমন্ত্রী
সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই লোমহর্ষক ও নৃশংস ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় আশ্বস্ত করেন যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঘটনার তদন্তে সর্বোচ্চ তৎপরতা দেখানোর এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন।
প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দেন, অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো নিষ্পাপ শিশুকে এমন নৃশংসতার শিকার হতে না হয়।
উল্লেখ্য, চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার সহযোগী স্বপ্না আক্তারকে পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রধান আসামি ইতোমধ্যে আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নিহতের বাসায় আগমন এবং সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে রামিসার পরিবারসহ পল্লবী এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। 'জাস্টিস ফর রামিসা' দাবিতে উত্তাল মিরপুরবাসী আশা প্রকাশ করেছেন যে, প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও কার্যকর করা হবে।