ঢাকা, ২১ মে ২০২৬:
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তরুণদের ধূমপান থেকে বিরত রাখতে আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সব ধরনের তামাকপণ্যের ওপর কার্যকর কর আরোপ এবং মূল্যবৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন বক্তারা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দ্য রুরাল পুওর (ডরপ) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ দাবি জানানো হয়।
সভায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে সিগারেটের চার স্তরের মূল্য কাঠামো বিদ্যমান—নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম। উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয় যে বাজারে বিক্রিত প্রায় ৯০ শতাংশ সিগারেট নিম্ন ও মধ্যম স্তরের হওয়ায় তামাকপণ্য তরুণ ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।
প্রবন্ধে নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার সিগারেট প্যাকেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি উচ্চ স্তরের সিগারেটের মূল্য ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের মূল্য ২০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে সব স্তরে ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা এবং প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
মূল প্রবন্ধে দাবি করা হয়, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ১ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি তরুণের অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এমপি বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের পাশাপাশি কার্যকর করনীতি ও মূল্যবৃদ্ধিও অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও সিগারেটের দাম তুলনামূলক কম হারে বেড়েছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যেও সিগারেট তুলনামূলকভাবে আরও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে, যা তরুণ সমাজের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি ভোক্তা তৈরির উদ্দেশ্যে কৌশলগতভাবে তরুণদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। তিনি এ বিষয়ে সংসদে কথা বলার এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করার আশ্বাস দেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সুলতানা জেসমিন জুঁই এমপি বলেন, তামাকের ক্ষতি শুধু ব্যবহারকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব নারী, শিশু ও পুরো পরিবারের ওপর পড়ে। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের তামাক ব্যবহারের হার অন্যতম বেশি এবং প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে অকাল মৃত্যুর শিকার হন।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালে তামাকজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির অর্থনৈতিক বোঝা প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা তামাক খাত থেকে অর্জিত রাজস্বের তুলনায় অনেক বেশি।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, কার্যকর তামাক করনীতি একই সঙ্গে ধূমপান কমাতে এবং সরকারের রাজস্ব বাড়াতে সক্ষম। ফিলিপাইনে সিন ট্যাক্স সংস্কার ও অভিন্ন কর কাঠামো চালুর পর সিগারেট বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং সরকারি রাজস্ব বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন এমপি বলেন, বিদ্যমান তামাক কর কাঠামোর কারণে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে। তিনি বলেন, কার্যকর তামাক করনীতি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে এবং তরুণদের তামাকাসক্তি থেকে রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ডরপের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এএইচএম নোমান। সমাপনী বক্তব্য দেন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উপ-নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জোবায়ের হাসান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন তামাকবিরোধী যুব প্রতিনিধি নাইমা আহমেদ, ইমরান হাসানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।