কানাডার কিছু পণ্যে আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে শিথিল করবে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউস শুক্রবার জানিয়েছে, এর আওতায় আছে প্লাইউড, কাগজ ও যন্ত্রপাতি। একই সঙ্গে কার্পেটসহ কয়েকটি পণ্যে নতুন শুল্ক বসানো হবে।
বিবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আংশিক শুল্কছাড় এসেছে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দুই সপ্তাহেরও কম আগে। মেইন অঙ্গরাজ্যে আসন ধরে রাখতে কঠিন লড়াইয়ে থাকা রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স জানিয়েছেন, এই পরিবর্তনের জন্য তিনি তদবির করেছিলেন।
তবে এতে দুই প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্যযুদ্ধ শেষ হচ্ছে না। কিছু পণ্যে লড়াই কমছে, আবার কিছু পণ্যে বাড়ছে। কানাডা জানিয়েছে, নতুন পদক্ষেপগুলো তারা এখনো মূল্যায়ন করছে।
কোন কানাডীয় পণ্যে শুল্ক উঠছে, কোনগুলোতে নতুন শুল্ক
হোয়াইট হাউসের ঘোষণা অনুযায়ী, ৩০ অক্টোবর থেকে যেসব পণ্যে শুল্ক শিথিল হবে:
- প্লাইউড শিট
- কিছু কাগজজাত পণ্য
- নির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রপাতি
- রেফ্রিজারেশন সরঞ্জাম
- কিছু প্যাকিং ক্রেট ও বাক্স
অন্যদিকে কার্পেট ও "বর্জ্য পণ্যের" মতো কিছু পণ্যে নতুন শুল্ক আরোপ করা হবে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। শুল্কমুক্ত এবং নতুন শুল্কের আওতায় আসা পণ্যের পূর্ণ তালিকা বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
হোয়াইট হাউস বলেছে, এই পদক্ষেপ "আমেরিকান শ্রমিকদের সুরক্ষা ও ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত করতে" প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের "অব্যাহত প্রচেষ্টার" প্রতিফলন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিডলটনের ভাষ্য, ট্রাম্প "মার্কিন বাণিজ্যের প্রতি কানাডার বৈষম্যমূলক আচরণের" জবাব দিয়ে যাচ্ছেন।
কানাডার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্লাঙ্ক সতর্ক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, "এই সর্বশেষ পদক্ষেপগুলো আমরা মূল্যায়ন করছি। এর মধ্যেও কানাডা আরও পারস্পরিক লাভজনক এবং কানাডার স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি বাণিজ্য সম্পর্ক গড়তে গঠনমূলকভাবে ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।"
সুসান কলিন্সের তদবির ও মেইনের কৃষি
শুল্কছাড়ের খবর প্রথম জানান সিনেটর কলিন্স। তাঁর দাবি, এতে মেইনের কৃষি খাত উপকৃত হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে তিনি বারবার শুল্কছাড় চেয়েছিলেন বলে জানান।
এক্সে কলিন্স লেখেন, ছাড় পাওয়া পণ্যগুলো "ব্লুবেরি, আলু, আপেল ও সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদকসহ মেইনের কৃষি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।" তিনি আরও বলেন, বাড়তি ছাড় আদায় এবং "আমাদের প্রতিবেশী, মিত্র ও সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার" কানাডার সঙ্গে বৃহত্তর বাণিজ্য চুক্তির জন্য প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি কাজ চালিয়ে যাবেন।
মেইনের সীমান্তে রয়েছে কানাডার নিউ ব্রান্সউইক ও কুইবেক প্রদেশ। বিবিসি জানিয়েছে, অন্য সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোর মতো মেইনের অর্থনীতিও কানাডার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কয়েক মাস ধরে চলা বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব সেখানে পড়েছে।
কলিন্সের ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রয় জ্যাকসনের মতে, এই ছাড় যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, "ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ মেইনবাসীর জীবন কঠিন ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে। সুসান কলিন্স এই বিশৃঙ্খলায় সায় দিয়েছেন, এর পেছনের লোকদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে ভোট দিয়েছেন। আর এখন আগুন নেভাতে এক কাপ পানি এনে কৃতিত্ব চাইছেন।"
সীমান্ত বাণিজ্য নিয়ে চাপে আছেন অন্য রিপাবলিকানরাও। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্যনির্ভর মিশিগানের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা মাইক রজার্স কয়েক মাস ধরে বিজ্ঞাপনে এই নীতির পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন। এখন তিনিই ট্রাম্পকে এই অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে আহ্বান জানিয়েছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলেই ঠিক হবে, ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান না ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকবে।
কেন কানাডার পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র?
গত আগস্টে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যায়। এরপর কানাডার ২০ বিলিয়ন ডলার (১৫ বিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প বলেছিলেন, মার্কিন গাড়ি, দুগ্ধজাত পণ্য ও অ্যালকোহল রপ্তানির সঙ্গে "অসম আচরণের" জবাবে এই শুল্ক।
জবাবে কানাডাও একের পর এক পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এগুলোকে "আমাদের শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয়" বলে উল্লেখ করেন। গত মাসে তিনি মার্কিন শুল্কের জবাবে "ডলারে ডলারে" সমপরিমাণ শুল্ক বসান। বিবিসি জানিয়েছে, বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্নি ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি কত দূরে?
দুই পক্ষের কাছ থেকে ভিন্ন বার্তা আসছে। শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির জন্য কানাডা "খুব পরিশ্রম করছে।"
কানাডার সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসির বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, কার্নি পারস্পরিক লাভজনক চুক্তির জন্য প্রস্তুত, তবে অপেক্ষা করতেও রাজি। কার্নি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র রাজি থাকলে আজ বিকেলেই আমরা সই করতে পারি। আর যদি একটি যথাযথ চুক্তির জন্য কয়েক মাস বা তারও বেশি সময়, এমনকি আরেকটি প্রশাসন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, আমরা তা-ই করব।"
কর্মকর্তা পর্যায়ে যোগাযোগ অবশ্য চলছে। লেব্লাঙ্ক বৃহস্পতিবার জানান, কানাডার একটি প্রতিনিধিদল কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের পর এটি ছিল এ ধরনের নবম বৈঠক। বিবিসি জানিয়েছে, বৈঠকে কানাডায় মার্কিন শুল্কের চলমান প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়।
কার্পেট ও "বর্জ্য পণ্যে" নতুন মার্কিন শুল্কের জবাবে অটোয়া কী করবে, তা এখনো জানা যায়নি। প্লাইউড, কাগজ, যন্ত্রপাতি, রেফ্রিজারেশন সরঞ্জাম ও কিছু প্যাকিং ক্রেটে শিথিল শুল্ক কার্যকর হবে ৩০ অক্টোবর। এর কয়েক দিন পরই মেইনের ভোটাররা কলিন্স ও জ্যাকসনের মধ্যে একজনকে বেছে নেবেন।