কঙ্গোকেন্দ্রিক ইবোলা প্রাদুর্ভাব ২০২৬-এ আক্রান্তের সংখ্যা ১০,০০০ ছাড়িয়েছে, মৃত্যু প্রায় ৫,০০০। আফ্রিকার তিনটি অঞ্চলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান গতকাল বুধবার এ খবর দিয়েছে।
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (আফ্রিকা সিডিসি) মহাপরিচালক জ্যঁ কাসেয়া গার্ডিয়ানকে বলেছেন, প্রাদুর্ভাবটি যুক্তরাজ্যসহ অন্য দেশেও পৌঁছাতে পারে। তিনি একে কোভিড মহামারির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
“আমরা চাই সব দেশ জানুক, যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে তারা নিরাপদ নয়,” বলেন কাসেয়া।
কাসেয়ার মতে, এখন শুধু আফ্রিকা নয়, সব মহাদেশের প্রতিটি দেশকে প্রস্তুতির মাত্রা এবং চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিনি মনে করিয়ে দেন, কোভিড প্রথমে চীনে ছড়ায়। পরে তা বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের প্রাণ নেয় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত করে।
“আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, কোভিডের শুরুতে অনেক দেশ বলেছিল তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি শূন্য, কিন্তু কয়েক মাস পর তারাই হটস্পট হয়ে ওঠে,” বলেন তিনি।
আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কত
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখিত হিসাবে মোট শনাক্ত রোগী ১০,০৯১ জন। তাঁদের মধ্যে ১০,০৬০ জনই কঙ্গোর। দেশটিতে মৃত্যু হয়েছে ৪,৮৮৭ জনের। উগান্ডায় দুজন এবং কেনিয়ায় দুজন মারা গেছেন।
এসব সংখ্যা একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে নেওয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা আফ্রিকা সিডিসির পরবর্তী হালনাগাদ তথ্যে সংখ্যা বদলাতে পারে।
কঙ্গোতে ইবোলা কীভাবে শুরু, কোন কোন দেশে ছড়াল
ইবোলা শনাক্ত হওয়ার পর এটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর ১৭তম প্রাদুর্ভাব। এর কারণ বুন্দিবুগিও ভাইরাস। দেশটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব।
কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৫ মে ইতুরি প্রদেশে প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করে। তবে ভাইরাসের জিনগত বিন্যাস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংক্রমণ শুরু হয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে।
গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমণের বিস্তার এখন পর্যন্ত এ রকম:
- পূর্ব আফ্রিকা: কেনিয়া ও উগান্ডা।
- পশ্চিম আফ্রিকা: নাইজেরিয়া। গত সপ্তাহে রাজধানী আবুজায় উগান্ডা থেকে আসা এক নারীর শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হয়।
- আফ্রিকার বাইরে: কেবল ফ্রান্স। জুনে কঙ্গো থেকে ফেরা এক চিকিৎসক আক্রান্ত হন।
“এই প্রথম আফ্রিকার তিনটি অঞ্চল ইবোলায় আক্রান্ত হলো। এই প্রাদুর্ভাবের ভৌগোলিক বিস্তার নজিরবিহীন,” বলেন কাসেয়া।
প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে কোনো রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য নেই।
ইবোলা কীভাবে ছড়ায়, বুন্দিবুগিও ভাইরাসের চিকিৎসা আছে কি
ইবোলা অত্যন্ত সংক্রামক ও গুরুতর রোগ, যা প্রায়ই প্রাণঘাতী হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা বমির মতো শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শে এটি ছড়ায়। মৃতদেহের সংস্পর্শেও ছড়াতে পারে, যেমন দাফন বা সৎকারের প্রস্তুতির সময়।
বুন্দিবুগিও ভাইরাসের কোনো অনুমোদিত চিকিৎসা নেই। টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলছে। কাসেয়া জানিয়েছেন, তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে এর ফল পাওয়া যাওয়ার কথা।
প্রতিশ্রুত ৩ বিলিয়ন ডলারের ২ বিলিয়নের বেশি এখনো বাকি
গার্ডিয়ান জানিয়েছে, সুরক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন বকেয়া থাকায় প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা ব্যাহত হচ্ছে। বেতন না পেয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা ধর্মঘটও করেছেন। কঙ্গোর সংঘাত, কর্মকর্তাদের প্রতি স্থানীয় মানুষের অবিশ্বাস, ভুল তথ্য এবং বৈশ্বিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
কাসেয়ার হিসাবে, বিভিন্ন সরকার ৩ বিলিয়ন ডলার (২.৩ বিলিয়ন পাউন্ড) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তার মধ্যে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি এখনো পাওয়া যায়নি। আফ্রিকার দেশগুলো দিয়েছে ১২০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি। বাকি অর্থ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছ থেকে আসার কথা।
“এই অর্থ আমাদের এখনই দরকার,” বলেন কাসেয়া। তাঁর সতর্কবার্তা, এখন অর্থ না দিলে প্রাদুর্ভাব ছড়াতে থাকবে। আরও দেশ আক্রান্ত হলে তা থামাতে লাখো কোটি (ট্রিলিয়ন) ডলারের প্রয়োজন হবে।
ইতুরির নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না বলেও জানান কাসেয়া। “নেতাদের বলতে চাই, এই প্রাদুর্ভাব বিদ্রোহীদের জন্য নয়, সরকারি সেনাবাহিনীর জন্যও নয়, এটি সবার জন্য। ইবোলা যে কাউকে আক্রান্ত করতে পারে,” বলেন তিনি।
সীমান্ত পেরিয়ে সহযোগিতা বাড়াতে বুধবার আফ্রিকার স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের বৈঠক ডাকার কথা জানিয়েছিলেন কাসেয়া। ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল থেকে আসা মানুষের জন্য প্রবেশ ও বহির্গমনের পথে স্ক্রিনিং ও পরীক্ষা চালু করতে সরকারগুলোকে তিনি আহ্বান জানাচ্ছেন। ওই বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি।
নভেম্বরে আফ্রিকার রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় একটি ‘শান্তি করিডর’ চাইবেন কাসেয়া। সেখানে নেতারা এতে সম্মত হবেন কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।