ইসরায়েলের ২৬তম কনেসেট নির্বাচন হবে মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর। এতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট, আর জনমত জরিপে শীর্ষে রয়েছে তাঁর দল ইয়াশার। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও দ্য জেরুজালেম পোস্ট এ খবর দিয়েছে।
সিএনএন জানিয়েছে, ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকটের সমর্থন এক বছর আগেও জরিপে এক অঙ্কের ঘরে ছিল। এখন তিনি বিরোধী শিবিরের প্রধান প্রার্থী। ইসরায়েলে এ পর্যন্ত কোনো মিজরাহি প্রধানমন্ত্রী হননি। তিনি জয়ী হলে হবেন প্রথম।
তবে জরিপে প্রথম হওয়াই যথেষ্ট না-ও হতে পারে। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট বা নেতানিয়াহুবিরোধী জোট, কোনোটিই ১২০ আসনের পার্লামেন্টে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে নেই। ফলে কে সরকার গড়বেন, তা ঠিক হতে পারে জোটের অঙ্কে। সেই অঙ্কে আরব দলগুলোর ভূমিকাও থাকতে পারে।
বেশি আসন পেলেই কি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন আইজেনকট?
সিএনএন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বেশির ভাগ জরিপে ইয়াশার ২০ থেকে ২৩টি আসন পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা লিকুদের চেয়ে বেশি। দ্য জেরুজালেম পোস্টের হিসাবে এই সংখ্যা ২১ থেকে ২৩। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কে বেশি উপযুক্ত, সেই জরিপেও আইজেনকট নেতানিয়াহুর চেয়ে এগিয়ে। তবে জরিপ ভুল হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সিএনএন।
ইসরায়েলের ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় দলের নেতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকার গঠনের দায়িত্ব পান না। প্রেসিডেন্ট সেই দায়িত্ব দেন এমন আইনপ্রণেতাকে, যিনি জোট গড়তে সবচেয়ে বেশি সক্ষম বলে মনে হয়। নেতানিয়াহুর জোটে আছে উগ্র ডানপন্থী ও অতি-অর্থোডক্স দলগুলো। সিএনএন রাজনৈতিক অচলাবস্থাকে "খুবই বাস্তব সম্ভাবনা" বলে বর্ণনা করেছে।
সিএনএন বলছে, আইজেনকটের ক্ষমতায় যাওয়ার পথে বাম, ডান ও মধ্যপন্থী দলগুলোকে লাগবে। কিছু পরিস্থিতিতে তাঁকে আরব দলগুলোর ওপরও নির্ভর করতে হতে পারে। নেতানিয়াহু বছরের পর বছর আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতাকে অবৈধ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। বিরোধী শিবিরের কয়েকজন নেতাও জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করবেন না।
আইজেনকট বলেছেন, ৬১ আসন না পেলেও তিনি সরকার গঠনের চেষ্টা করবেন। এতে আরব দলগুলোর সমর্থনে টিকে থাকা একটি সংখ্যালঘু সরকারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইয়াশার পার্টি: গাজা, ইরান, লেবানন ও হারেদি সেনাসেবা নিয়ে অবস্থান
দ্য জেরুজালেম পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াশার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠিত মধ্যপন্থী দল। ২৫তম কনেসেটে দলটির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পত্রিকাটি দলের প্রধান অবস্থানগুলো তুলে ধরেছে:
- গাজা: হামাসকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একটি ইসরায়েলি নিরাপত্তা করিডর বহাল রাখা। আংশিক নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে পুনর্গঠন এগোবে। চলতি অক্টোবরের শুরুতে আইজেনকট ১৮ মাসের মধ্যে হামাসের সামরিক শাখা ধ্বংস ও নেতৃত্ব ভেঙে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
- ফিলিস্তিন রাষ্ট্র: তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী। তবে পোস্টকে বলেছেন, বিকল্প যদি এই দুটিই হয়, তাহলে হামাসের শাসন চলার চেয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে তিনি ভালো বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করবেন।
- পশ্চিম তীর: সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দায়িত্ব আবার সামরিক সমন্বয়ের অধীনে ফিরিয়ে আনা এবং পুলিশি কার্যক্রমে সামরিক সমন্বয় পুনর্বহাল করা।
- লেবানন: একটি নিরাপত্তা অঞ্চল গড়ার পক্ষে তিনি। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের আরও জোরালো সম্পৃক্ততা চান।
- ইরান: পারমাণবিক হুমকির দীর্ঘস্থায়ী ও যাচাইযোগ্য সমাধান চান। কূটনীতি ব্যর্থ হলে অবশিষ্ট সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্থাপনার চারপাশে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে বিধিনিষেধ কার্যকর করা এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিরুদ্ধে বিস্তৃত গোপন অভিযানের প্রস্তাব রয়েছে।
- হারেদি সেনাসেবা: অতি-অর্থোডক্সদের ঢালাও অব্যাহতির বিরোধী দলটি। সেবা এড়ালে নিষেধাজ্ঞা আর সেবা দিলে সুবিধার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে প্রতিবছর হারেদি তরুণদের ৩ শতাংশকে তোরাহ অধ্যয়নের জন্য অব্যাহতি দেওয়া হবে। কোনো অব্যাহতিই চান না এমন বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বীরা এর সমালোচনা করেছেন।
- সৈনিকদের বেতন: সেপ্টেম্বরের যুব পরিকল্পনায় বাধ্যতামূলক সেবায় থাকা সৈনিকদের বেতন ১৫ শতাংশ এবং তৃতীয় বর্ষের যুদ্ধসৈনিকদের বেতন ৫০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব।
পোস্ট জানিয়েছে, অর্থনীতিবিদ ও ইয়াশারের প্রার্থী শাউল মেরিডর দলের অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে রেখেছেন "কর্মজীবী মধ্যবিত্ত, তরুণ ও সেবাদানকারী মানুষদের"।
কে এই গাদি আইজেনকট
মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান আইজেনকট বড় হয়েছেন তিবেরিয়াস ও এইলাতে। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়, পাঁচ সন্তানের বাবা। সিএনএন জানিয়েছে, ১৯৭৮ সালে তিনি গোলানি ব্রিগেডে যোগ দেন। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত নেতানিয়াহুর অধীনে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর চিফ অব স্টাফ ছিলেন।
২০১৬ সালে হেবরনে সার্জেন্ট এলর আজারিয়া আহত এক ফিলিস্তিনি হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করেন। সিএনএন জানায়, নেতানিয়াহুসহ ডানপন্থী রাজনীতিকদের চাপ উপেক্ষা করে আইজেনকট ওই ঘটনার সামরিক তদন্ত ও বিচারের পক্ষে অবস্থান নেন।
দ্য জেরুজালেম পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২২ সালের আগস্টে বেনি গান্তজের ন্যাশনাল ইউনিটি জোটের তালিকায় তৃতীয় স্থানে থেকে রাজনীতিতে আসেন। শুরুতে নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করার সম্ভাবনা নাকচ করলেও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর তিনি ও গান্তজ জরুরি সরকারে যোগ দেন। সিএনএনের মতে, দুজনই যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় ছিলেন। পোস্টের মতে, গান্তজ সদস্য ছিলেন আর আইজেনকট ছিলেন পর্যবেক্ষক।
২০২৪ সালের জুনে দুজনই সরকার ছাড়েন। সিএনএন বলছে, তাঁরা যুদ্ধ-পরবর্তী সুস্পষ্ট কৌশল না থাকার কথা বলেছিলেন। পোস্টের ভাষ্য, তাঁরা অভিযোগ করেছিলেন যে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় লড়াইয়ে নিহত হন তাঁর ছোট ছেলে ২৫ বছর বয়সী গাল। যুদ্ধে প্রাণ হারান তাঁর দুই ভাতিজাও। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ইয়েদিওথ আহরোনথ পত্রিকায় আইজেনকট লেখেন:
"গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শপথ করেছিলাম, সে এবং তার বন্ধুরা, যাদের সে চিনত এবং যাদের চিনত না, তারা যে মূল্য দিয়েছে তা বৃথা যাবে না।"
২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজনের কথা বলে তিনি ন্যাশনাল ইউনিটি ছাড়েন এবং কনেসেট থেকে পদত্যাগ করেন।
ইনন মাগালের মন্তব্য ও মিজরাহি পরিচয়ের প্রশ্ন
সিএনএন জানিয়েছে, টিভি উপস্থাপক ইনন মাগালকে ব্যাপকভাবে নেতানিয়াহুর মুখপাত্র হিসেবে দেখা হয়। তিনি আইজেনকটকে "আশকেনাজি অভিজাতদের" দ্বারা পরিচালিত "মিজরাহি-মরোক্কান" বংশোদ্ভূত এক "বানর" বলে অভিহিত করেন। এই মন্তব্যে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা ইহুদিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈষম্যের প্রসঙ্গ উঠে আসে।
পরে মাগাল দাবি করেন, আইজেনকটের জাতিগত পরিচয় নিয়ে উপহাস করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি বলেন, পর্দার আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রিত সামনের মুখ বোঝাতে অপরাধজগতের একটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। নেতানিয়াহু এই মন্তব্যের নিন্দা জানান।
সিএনএন লিখেছে, বহু মিজরাহি ভোটার ঐতিহ্যগতভাবে লিকুদকে সমর্থন করে আসছেন। আইজেনকট নিজের জাতিগত পরিচয়ের কথা খুব কমই বলেন। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এটিও তাঁর আবেদনের একটি অংশ।
ইয়াশার প্রথম হলেও নেতানিয়াহুর জোটকে যদি জোট গড়তে বেশি সক্ষম মনে হয়, প্রেসিডেন্ট কাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। আরব দলগুলোর সমর্থনে চলা সংখ্যালঘু সরকারকে অন্য বিরোধী দলগুলো মেনে নেবে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।