মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার মিশিগানের পোর্ট হিউরনে এক নির্বাচনী সমাবেশে ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আব্দুল এল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’ বলেছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এল-সাইয়েদ জিতলে বড়দিন বাতিল হয়ে যাবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে এই আক্রমণ এল। আল জাজিরা জানিয়েছে, মিশিগানের এই আসন হাতেগোনা প্রায় সাতটি ‘টস-আপ’ বা হাড্ডাহাড্ডি সিনেট আসনের একটি। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের জন্য আসনটিকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হচ্ছে।
এল-সাইয়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্স সমাবেশে ট্রাম্পের সঙ্গে মঞ্চে ওঠেন। অথচ ইরান যুদ্ধ ও শুল্কনীতিতে তিনি আগে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ভিন্নমত দেখিয়েছিলেন।
মিশিগানের সমাবেশে এল-সাইয়েদকে নিয়ে কী বললেন ট্রাম্প
আল জাজিরা জানায়, ট্রাম্প কয়েক শ সমর্থকের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টা বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল মিশিগানের সিনেট নির্বাচন।
“আমি এখানে এসেছি একজন জিহাদি মুসলিম ব্রাদারহুড সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হওয়া থেকে আটকাতে,” বলেন ট্রাম্প।
এল-সাইয়েদ সম্পর্কে তিনি বলেন, “তিনিই হবেন একমাত্র সিনেটর, যাঁকে সিনেটে ঢোকার অনুমতি পাওয়ার আগে মেটাল ডিটেক্টরের ভেতর দিয়ে যেতে হবে।”
আল জাজিরার ভাষ্যে, ট্রাম্প মিথ্যাভাবে অভিযোগ করেন যে এল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামি আইন চাপিয়ে দিতে চান। ট্রাম্প বলেন, “তো আব্দুল… চান আমাদের দেশ শরিয়া আইনে চলুক। আর তিনি যদি কখনো তা করে ফেলেন, তবে প্রথম বিচার হওয়া উচিত তাঁরই। আমি সাক্ষী হব।”
মুসলিম অভিবাসন নিয়ে ভয়ের প্রসঙ্গও টানেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, “আব্দুল আর ডেমোক্র্যাটরা জিতলে তাঁরা দরজা খুলে দেবেন, দলে দলে জিহাদিকে আমাদের উপকূলে ডেকে আনবেন। সহিংসতা আর সন্ত্রাসের এমন দুঃস্বপ্ন তৈরি হবে যে আপনি বড়দিনও পালন করতে পারবেন না।”
সমাবেশে এল-সাইয়েদের নাম উচ্চারিত হলে কয়েকবার উপস্থিত কেউ কেউ ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে চিৎকার করেন বলে আল জাজিরা জানিয়েছে। সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ট্রাম্প বারবার এল-সাইয়েদের মুসলিম পরিচয়কে নিশানা করেছেন। তাঁর নাম বিকৃত করে ‘মোহাম্মদ’ বলেছেন।
এল-সাইয়েদ কি মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য?
আল জাজিরা অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলেছে। সংবাদমাধ্যমটির তথ্য অনুযায়ী, এল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নাগরিক ও সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তিনি সংবিধান সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি কখনো মুসলিম ব্রাদারহুড বা কোনো বিদেশি সংগঠনের সদস্য ছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ নেই।
আল জাজিরা এল-সাইয়েদকে একজন প্রগতিশীল চিকিৎসক হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর আগে মুসলিমবিরোধী বক্তব্যকে মূলত ‘মনোযোগ সরানোর’ চেষ্টা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেছেন, তাঁর মনোযোগ জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর দিকে। রোববারের সমাবেশ নিয়ে তাঁর সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া আল জাজিরার প্রতিবেদনে আসেনি।
আল জাজিরা লিখেছে, ২০১৬ সালের নির্বাচনী চক্র থেকে ট্রাম্প রাজনৈতিক লাভের জন্য মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। ২০১৫ সালে প্রথম প্রচারণার শুরুতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ ‘সম্পূর্ণভাবে বন্ধ’ করার পক্ষে কথা বলেছিলেন। দুই বছরেরও কম সময় পর প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশ থেকে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করে একটি স্বল্পস্থায়ী নির্বাহী আদেশে সই করেন, যা ‘মুসলিম ব্যান’ নামে পরিচিতি পায়।
আব্দুল এল-সাইয়েদ মাইক রজার্স লড়াই: ভিন্নমত সত্ত্বেও মঞ্চে রজার্স
অবসরে যাচ্ছেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্স। তাঁর ছেড়ে যাওয়া উন্মুক্ত আসনে লড়ছেন এল-সাইয়েদ ও রজার্স।
আল জাজিরা জানায়, সমাবেশের শুরুর দিকে রজার্সও দাবি করেন যে এল-সাইয়েদের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের যোগাযোগ আছে। সংবাদমাধ্যমটি ব্রাদারহুডকে মিসরের একটি রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করেছে, যাকে যুক্তরাষ্ট্র এ বছর ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠী ঘোষণা করেছে।
রজার্স এর আগে ইরান যুদ্ধের অবসান চেয়েছেন এবং ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। মিশিগানের সীমান্তবর্তী দেশ কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। আল জাজিরার মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে আংশিকভাবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে থাকা কিছু রিপাবলিকান প্রার্থী তাই তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন।
মার্কেটিং রিসোর্স গ্রুপের চলতি মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, মিশিগানের মাত্র ৩৫ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পকে ইতিবাচকভাবে দেখেন বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
মিশিগান সিনেট নির্বাচন ২০২৬ কীভাবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ঠিক করতে পারে
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, সিনেটে এখনকার হিসাব এমন:
- মোট আসন: ১০০টি; রিপাবলিকানদের হাতে ৫৩টি
- ২০২৬ সালে নির্বাচন হচ্ছে ৩৫টি আসনে
- হাড্ডাহাড্ডি আসন: প্রায় সাতটি
- ভোটের দিন: ৩ নভেম্বর
রজার্স জিতলে ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা আসনটি রিপাবলিকানদের হাতে যাবে। তখন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ডেমোক্র্যাটদের আরও পাঁচটি আসন দখল করতে হবে।
এল-সাইয়েদ ও রজার্সের মধ্যে সরাসরি তুলনামূলক কোনো জরিপ আল জাজিরার প্রতিবেদনে নেই। ৩ নভেম্বর মিশিগানের ভোটাররা দুজনের একজনকে বেছে নেবেন। সেই ফল সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে কি না, তা নির্ভর করছে বাকি হাড্ডাহাড্ডি আসনগুলোর ফলের ওপর।