ঢাকা, ২৪ জুন ২০২৬: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে জাতীয় বাজেটে তামাকজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার।
বুধবার ঢাকার বিএমএ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত “তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়” শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এবং ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দ্য রুরাল পুওর (ডর্প)।
ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষায় সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার পূর্ববর্তী সময়টি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে জেবা আফরোজা বলেন, জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে বিদ্যমান চার স্তরের সিগারেট মূল্য কাঠামো কমিয়ে তিন স্তরে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে কর প্রশাসন আরও সহজ ও কার্যকর হয়।
তিনি বলেন, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের দামের পার্থক্য খুবই কম হওয়ায় একটি স্তরের দাম বাড়লে ধূমপায়ীরা সহজেই অন্য স্তরের তুলনামূলক কম দামের সিগারেটে চলে যান। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা এই দুটি স্তর একীভূত করে ১০ শলাকার একটি সিগারেট প্যাকেটের খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছেন।
এছাড়া সব স্তরের সিগারেটের ওপর বিদ্যমান ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৪ টাকা নির্দিষ্ট কর আরোপেরও সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে তামাকজাত পণ্য বিশেষ করে তরুণদের কাছে কম সাশ্রয়ী হবে এবং ধূমপান শুরুর প্রবণতা কমবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. শাফিউন নাহিন বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের দামে খুব সামান্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। নিম্ন স্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের দাম ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকা করা হয়েছে, যদিও দেশের মোট সিগারেট বিক্রয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশই এই স্তরের সিগারেট।
তিনি বলেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি থাকা অবস্থায় প্রতি প্যাকেটে মাত্র ২ টাকা মূল্য বৃদ্ধি ধূমপান নিরুৎসাহিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
ডা. নাহিন আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী নিম্ন স্তরের সিগারেটের খুচরা মূল্য প্রতি শলাকা ৬ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও বাজারে এসব সিগারেট ইতোমধ্যে ৭ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। ফলে প্রতি শলাকায় প্রায় ৮০ পয়সা অতিরিক্ত মুনাফা তামাক কোম্পানিগুলোর হাতে যাচ্ছে, যা করের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
তিনি জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৬৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন নিম্ন স্তরের সিগারেট বিক্রি হয়েছে। প্রতি শলাকায় অতিরিক্ত ৮০ পয়সা মুনাফার হিসাবে তামাক কোম্পানিগুলো প্রায় ৫ হাজার ৫১২ কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারে, যা সরকারের জন্য বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির কারণ হবে।
বক্তারা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আলোচক হিসেবে বক্তব্যে ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জাহিরুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে নিকোটিন পাউচ, নিকোটিন গ্রানিউল এবং হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস (এইচটিপি)-এর ওপর কর আরোপ করা হয়েছে। তবে এসব পণ্যের ওপর কর আরোপ কার্যত বাজারে এগুলোকে বৈধতা দেবে এবং নতুন নিকোটিন পণ্যের বিস্তার ঘটাবে, যা বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে নিকোটিন আসক্তির ঝুঁকি বাড়াবে।
ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ দীর্ঘমেয়াদে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ডর্পের সঙ্গে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিম্ন স্তরের সিগারেট ও ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের কর ও মূল্য কাঠামো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে সরকার অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ বিলিয়ন টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে। একই সঙ্গে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবেন, ৩ লাখ ৭২ হাজার তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৪ লাখ অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ডর্পের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম নোমান এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির উপ-নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জোবায়ের হাসান।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ইকবাল মাসুদ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এপিডেমিওলজি ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী, ড্যাবের সদস্যবৃন্দ এবং যুব প্রতিনিধি রাত্রী, সন্ধি ও অন্যান্যরা।