বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত কয়েক দশকে দেশটি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান কর্মসূচি, শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং গড় আয়ু বৃদ্ধিতে প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো—গ্রাম ও শহরের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য, ব্যয়বহুল চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট, অসংক্রামক রোগের (NCDs) বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যঝুঁকি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।
বিগত অন্ততবর্তীকালীন সময়ে আমাকে আমন্ত্রণ জানালে যে বিশদ প্রস্তাবনা করেছিলাম তা আলোর পথ দেখবে কিনা জানি না তাই এখানে কিছু চম্বুক অংশ শেয়ার করছি।
আমার বিগত দুই যুগের বেশী সময় আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কাজের অভিজ্ঞায় আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতকে আরও কার্যকর, ন্যায়ভিত্তিক, আধুনিক ও জনমুখী করার লক্ষ্যে একটি সুসংগঠিত ও দূরদর্শী স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কার জরুরী ।
স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, যেমন অনেকের মতে
“Promoting, Preventing, and Protecting Health and Well-Being in Bangladesh” শীর্ষক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কার প্রস্তাবনা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই করার জন্য আমরা কিছু কৌশলগত অগ্রাধিকার ক্ষেত্র চিহ্নিত করে কাজ শুরু করা।
আমার এই প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য ছিলো —২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জন এবং একটি কার্যকর Universal Health Coverage (UHC) ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, যাতে দেশের প্রতিটি নাগরিক আয়, ভৌগোলিক অবস্থান বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন।
চিকিৎসা শুধু রোগের চিকিৎসা নয়—স্বাস্থ্যকে রক্ষা, রোগ প্রতিরোধ এবং মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির মূল ভিত্তি।
কেন এখনই স্বাস্থ্য সংস্কার প্রয়োজন?
বাংলাদেশে এখনও স্বাস্থ্যসেবায় অসম প্রবেশাধিকার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের বহু মানুষ, বিশেষত প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণ, এখনও সময়মতো মানসম্মত চিকিৎসা পান না। অনেক পরিবারকে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে চরম আর্থিক সংকটে পড়তে হয়, যা Out-of-Pocket Health Expenditure-এর অন্যতম নেতিবাচক প্রভাব।
এছাড়া ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগ (NCDs) দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য, বৃদ্ধ জনসংখ্যা, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও চাপে ফেলছে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় একটি সমন্বিত, ভবিষ্যতমুখী এবং নাগরিককেন্দ্রিক স্বাস্থ্য সংস্কার রোডম্যাপ প্রস্তাব করা হয়েছে।
আমার প্রস্তাবনার প্রধান অগ্রাধিকার ক্ষেত্রসমূহ:-
১. প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ
আমি বিশ্বাস করি, Primary Healthcare-কেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা উচিৎ। এজন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও স্যাটেলাইট ক্লিনিক সম্প্রসারণ,টেলিমেডিসিন, এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতার উন্নয়ন ও জরুরি।
প্রত্যেক রোগীদের ছোটখাটো অসুস্থতার জন্য ঢাকামুখী না হয়ে স্থানীয় পর্যায়েই মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
২. দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি ও তাদের ধরে রাখার ব্যবস্থা করা
বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ ও জনস্বাস্থ্য পেশাজীবীদের পর্যাপ্ত সংখ্যা নিশ্চিত করা।
তাই আমি সুপারিশ করেছি —
স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন,গ্রামীণ অঞ্চলে কাজের জন্য বিশেষ প্রণোদনা,
পেশাগত উন্নয়ন ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ বৃদ্ধি করার।
৩. মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য (MCH) জোরদারকরন
বাংলাদেশের অর্জিত সফলতাকে আরও এগিয়ে নিতে তিনি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য (Maternal & Child Health)-কে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
নিরাপদ প্রসব, দক্ষ মিডওয়াইফ, প্রসব-পূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি MCH Handbook-এর মতো পরিবারভিত্তিক স্বাস্থ্য যোগাযোগ টুল চালুর সুপারিশ করা হয়েছে, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সমন্বিত করবে।
৪. জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা চালু করা এখন সময়ের দাবি
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ জনগণকে নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয়। ফলে অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দরিদ্র হয়ে পড়ে।
সেজন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা (Universal Health Insurance) চালুর আশু প্রয়োজন, যেখানে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি ভর্তুকিভিত্তিক প্রিমিয়াম থাকবে। এটি বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্যসেবা হবে আরও ন্যায়ভিত্তিক ও অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত।
৫. ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ
আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা তথ্যনির্ভর। তাই একটি কেন্দ্রীয় Health Informatics System গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মাধ্যমে রিয়েল-টাইম স্বাস্থ্য তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ সম্ভব হবে।
৬. মানসিক স্বাস্থ্য ও জলবায়ু স্বাস্থ্যঝুঁকির মোকাবিলা করা
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য এখনও অবহেলিত। পাশাপাশি বন্যা, তাপদাহ, ডেঙ্গু এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তাইজন্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্তি এবং জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বৃহৎ কর্ম তৎপর লোকবল তৈরির জন্যে মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের সংস্কারের আহ্বান
আমরা জানি এই পরিবর্তিত বিশ্বে, ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান জানলেই চলবে না—তাদের যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রযুক্তি ব্যবহার, গবেষণা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কেও দক্ষ হতে হবে।
তাই প্রস্তাবনায় MBBS এবং Postgraduate Medical Education-এ বাস্তবভিত্তিক ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল শিক্ষার মানের সমতা নিশ্চিতের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সর্বোপরি সুশাসন ছাড়া স্বাস্থ্য সংস্কার অসম্ভব
বাংলাদেশে এখন একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে সুশাসন, বিকেন্দ্রীকৃত স্বাস্থ্য প্রশাসন, দুর্নীতি হ্রাস, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP), এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলে একটি জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার মডেল হিসেবে দেখতে হবে।
তাই এখনই সময় সাহসী স্বাস্থ্য সংস্কারের
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে “সবার জন্য স্বাস্থ্য” (Health for All) বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে অবশ্যই প্রয়োজন একটি সমন্বিত, প্রযুক্তিনির্ভর, প্রতিরোধমুখী, রোগীকেন্দ্রিক ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা।
প্রস্তাবিত এই সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন (Policy Shift) আসতে পারে—যা শুধু স্বাস্থ্যসেবার মানই উন্নত করবে না, বরং একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল এবং মানবিক বাংলাদেশ গঠনের পথও প্রশস্ত করবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত—স্বাস্থ্য শুধু চিকিৎসা নয়, এটি একটি জাতির মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তি।