মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬-এ মিশিগান ও মেইনের সিনেট আসন ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে দায় কানাডার ওপর পড়তে পারে। তিনটি সূত্রের বরাতে সিটিভি নিউজ জানিয়েছে, মঙ্গলবার অটোয়ায় এক রুদ্ধদ্বার মধ্যাহ্নভোজে এ কথা বলেছেন কানাডায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হোকস্ট্রা।
নির্বাচন হবে ৩ নভেম্বর। ভোটের এক সপ্তাহও বাকি নেই, অথচ ওয়াশিংটন কানাডার বিরুদ্ধে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ জোরালো করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক এখন সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোতে তো বটেই, আরও দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যেও নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠেছে।
সমালোচকেরা বলছেন, ট্রাম্প নিজেই বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন। তাই এই অভিযোগ তোলার নৈতিক অবস্থান ওয়াশিংটনের আছে কি না, সে প্রশ্নও উঠছে।
মধ্যাহ্নভোজে হোকস্ট্রা কী বলেছিলেন, দূতাবাস কী বলছে
সিটিভি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোকস্ট্রার অটোয়ার সরকারি বাসভবনে ব্যবসায়ীদের নিয়ে এই মধ্যাহ্নভোজ হয়। সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাষ্ট্রদূত আলাদা করে মিশিগান ও মেইনের নাম নেন। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হলে এই দুই অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের জিততে হবে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, হোকস্ট্রা বলেছেন, ওই দুই অঙ্গরাজ্য ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে নির্বাচনের পর কানাডার জন্য পরিস্থিতি সম্ভবত কঠিন হবে। কারণ প্রেসিডেন্ট খুশি হবেন না, আর দায় কানাডার ঘাড়ে পড়তে পারে।
মার্কিন দূতাবাসের একজন মুখপাত্র সিটিভি নিউজকে বলেছেন, প্রতিবেদনে উল্লিখিত মন্তব্যগুলো "একটি বৃহত্তর আলোচনার প্রসঙ্গ থেকে চরমভাবে বিচ্ছিন্ন করে" উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে সেই বৃহত্তর প্রসঙ্গ কী, তা তিনি জানাননি।
"রাষ্ট্রদূত বরাবরই বলে আসছেন, কানাডার গণমাধ্যম মার্কিন নির্বাচনে কানাডীয় বিষয়গুলোর প্রাসঙ্গিকতা বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে। আমরা আগেও বলেছি, আমেরিকানরা তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ভিত্তিতেই আমেরিকার নির্বাচনের ফয়সালা করবেন," বলেন দূতাবাসের মুখপাত্র।
মধ্যাহ্নভোজের আয়োজনে যুক্ত ছিল কানাডিয়ান আমেরিকান বিজনেস কাউন্সিল। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী বেথ বার্ক জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানটি অফ দ্য রেকর্ড হওয়ার কথা ছিল এবং মন্তব্যগুলো প্রসঙ্গের বাইরে নেওয়া হচ্ছে। "রাষ্ট্রদূত যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্ক নিয়ে খুবই ইতিবাচক কথা বলেছেন, একটি চুক্তি হবে বলে আশাও প্রকাশ করেছেন," বলেন তিনি।
সিটিভি নিউজের তথ্যমতে, গত কয়েক সপ্তাহে হোকস্ট্রা অটোয়ার বিরুদ্ধে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন। কানাডাকে "নাক না গলাতে" সতর্কও করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কানাডার হস্তক্ষেপ: দূতাবাসের তালিকা ও পাল্টা প্রশ্ন
সিবিসি জানিয়েছে, অটোয়ার মার্কিন দূতাবাস বুধবার একটি "ফ্যাক্ট শিট" প্রকাশ করে। তাতে এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ আছে, যেগুলো দূতাবাসের ভাষায় "মার্কিন নির্বাচনে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ" হতে পারে। তালিকায় রয়েছে:
- লিবারেল এমপি অ্যান্থনি হাউসফাদারের চলতি বছরের প্রাইমারিতে ফ্লোরিডার এক ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর পক্ষে প্রচার। হাউসফাদারের ভাষ্য, ওই প্রার্থী তাঁর বন্ধু।
- কানাডার পাল্টা শুল্ক কৌশল নিয়ে শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলির বিভিন্ন মন্তব্য। এর কয়েকটি ২০২৫ সালের মার্চের, যখন তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
- গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রচারিত অন্টারিও সরকারের রোনাল্ড রিগ্যান বিজ্ঞাপন।
- ২০২৫ সালের শুরুতে ফেডারেল সরকারের বিলবোর্ড প্রচারণা।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও কানাডার অন্য রাজনীতিকেরা এর আগেই কানাডীয় কর্মকর্তারা ভোটের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন, এমন ইঙ্গিত নাকচ করেছিলেন।
সিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে প্রায় আধা ডজন প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে পোল্যান্ড, হন্ডুরাস, কলম্বিয়া ও জাপানের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীরা। তিনি হাঙ্গেরির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবানের ব্যর্থ পুনর্নির্বাচনী প্রচেষ্টাকেও সমর্থন দেন। সে সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বুদাপেস্টে এক সমাবেশে উপস্থিত হন।
সিবিসি আরও জানিয়েছে, গত বছর আর্জেন্টিনার মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের দল ভালো ফল করলে তবেই আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ মিলবে, এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কানাডার ২০২৫ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন, তিনি "কনজারভেটিভের চেয়ে লিবারেলের সঙ্গে কাজ করতেই" বেশি পছন্দ করবেন।
ফেব্রুয়ারিতে নিজের 'বোর্ড অব পিস'-এর উদ্বোধনী বৈঠকে ট্রাম্প বলেছিলেন, "আমার তো কাউকে সমর্থন দেওয়ার কথা নয়। কাজ হলেই আমার আপত্তি নেই।"
টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক ড্যানিয়েল ড্রেজনার সিবিসিকে বলেন, "সত্যি হলো, এই প্রশাসন মিত্র দেশগুলোর নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপের দীর্ঘ রেকর্ড রেখেছে।" কানাডায় সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস ব্ল্যানচার্ড বলেছেন, এ বিষয়ে বর্তমান প্রশাসনের "কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই"।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১৯ ও ২০২১ সালে জাস্টিন ট্রুডোকে সমর্থন দিয়েছিলেন। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ২০২১ সালে এনডিপির তৎকালীন নেতা জগমিত সিংকে সমর্থন দেন। ড্রেজনারের মতে, এগুলো আলাদা, কারণ তখন তাঁদের কেউই নির্বাহী বিভাগের অংশ ছিলেন না। কোনো কানাডীয় কর্মকর্তা মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রার্থীকে একইভাবে সমর্থন দিলে সেটিকে হস্তক্ষেপ ধরা হবে কি না, সিবিসির এ প্রশ্নে দূতাবাস মন্তব্য করেনি।
ট্রাম্প-কানাডা শুল্ক কীভাবে মিশিগান ও মেইনের লড়াইয়ে ঢুকল
সিটিভি নিউজ বুধবার জানায়, তার আগের শুক্রবার সিনেটর সুজান কলিন্সের পুনর্নির্বাচন বাঁচাতে ট্রাম্প মেইনকে প্রভাবিত করে এমন কিছু শুল্ক প্রত্যাহার করেছেন। মিশিগানে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্স প্রচার চালাচ্ছেন শুল্কের বিরুদ্ধে।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন জরিপ: প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট কোন দিকে
সিটিভি নিউজের তথ্যমতে, জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে ট্রাম্প ক্রমেই বৈরী ভোটারদের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং রিপাবলিকানদের সম্ভাবনা ক্ষীণ হচ্ছে। নির্দলীয় কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিষদকে ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকে থাকা হিসেবে দেখিয়েছে। সিনেটকে রেখেছে 'টস-আপ' বা অনিশ্চিত তালিকায়।
এর মধ্যেই দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা গত সপ্তাহে গতি পেয়েছে। সোমবার কানাডিয়ান আমেরিকান বিজনেস কাউন্সিলের এক অনুষ্ঠানে হোকস্ট্রা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র "যত দ্রুত সম্ভব" একটি চুক্তি চায়। সিটিভি নিউজ জানিয়েছে, অটোয়া মনে করছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক চাপ আলোচনায় একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তবে কর্মকর্তারা সতর্ক এবং সন্দিহান। হোকস্ট্রার মন্তব্যের "বৃহত্তর প্রসঙ্গ" কী ছিল, দূতাবাস তা এখনো জানায়নি।